অন্যদৃষ্টি
রাবীন্দ্রিক গোয়েন্দাগিরি
জাঁ-নেসার ওসমান
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২২ | ১৪:৪৩
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার 'শ্যামা' নৃত্যনাট্যে লিখেছিলেন, রাজকোষে চুরি হয়ে গেছে, এখন চোর চাই।
নগর কোটাল মানে তৎকালীন আইন রক্ষা বাহিনীর প্রধান নাঙ্গা তলোয়ার হাতে রাজ্যের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর সদম্ভে বলছেন, 'চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে-/ চোর চাই যে ক'রেই হোক, চোর চাই।/ হোক-না সে যে-কোনো লোক, চোর চাই।' ব্যস, এখানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোয়েন্দাগিরির বাহাদুরি। চোর চাই, চোর চাই, যে কোরেই হোক; হোক সে অন্য কোনো লোক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো আর এমনিতে নোবেল প্রাইজ পাননি। উনার বুদ্ধিমত্তাও শার্লক হোমসের মতো। তার এই গোয়েন্দাগিরির বুদ্ধিমত্তা যুগে যুগে বাংলার পরবর্তী প্রজন্ম লুফে নিল। আর বাঙালি কোটালরা মানে পরবর্তী আইন রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানরা রবীন্দ্রনাথের দেখানো পথ ধরে এগিয়ে গেলেন এবং প্রভূত প্রশংসা কুড়িয়ে গাদা গাদা মেডেলে ভূষিত হলেন।
এই যে বিগত শাসনামলে কোটাল একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় সর্বজনধিকৃত ভজ মিয়াকে ধরে ফেললেন। কীভাবে? খুবই সোজা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেখানো পথ ধরে উনি গোয়েন্দাদের হুকুম দিলেন-'চুরি হয়ে গেছে রাজকোষে-/ চোর চাই যে ক'রেই হোক, চোর চাই।/ হোক-না সে যে-কোনো লোক, চোর চাই।' আর সাথে সাথে ভজ মিয়া ধরা। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই মামলা সল্ভ্ড।
চারদিকে রাজকোটালের জয়জয়কার। ধন্য ধন্য পড়ে গেল। রাজ্যে উৎসব শুরু হলো। বাদ্যিরা ঢাক-ঢোল, ঝাঁঝর, কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে বাজি মাত করল। রাজকোটালকে যুবরাজ পাল্লাতে ওজন করে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করলেন। কারণ এত টাকা গুইন্না দেহনের টাইম নাই। জয় জয় নবজাত কোটাল, তুমি যে জনগণের রক্ষার ভগবান। ঘরে ঘরে, স্কুলে স্কুলে, কলেজে কলেজে রাজকোটাল সাহেবের নামে মানপত্র পাঠ করা হলো। সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হলো। গান রচনা হলো।
রাজকোটালের সম্মান আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। সবাই ধন্য ধন্য করল। যখন রাজকোটালকে প্রশ্ন করা হলো, আপনার এই সাফল্যের পেছনে কে প্রেরণা জুগিয়েছে? কে আপনার আইডল বা কে আপনার গুরু? রাজকোটাল সহাস্য বদনে বললেন, 'আমার গোয়েন্দাগিরির গুরু হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি জমিদারের ছেলে হয়েও তার নোবেল প্রাইজের সব টাকা দরিদ্র কৃষকের উপকারে গ্রামীণ ব্যাংক খুলে ঋণ দিয়েছেন। যিনি লুকিং ফর গরিব চাষি অ্যান্ড গিভিং টাকা। হি ইজ মাই মেন্টর, মাই আইডল, মাই পথপর্দশক, হি ইজ মাই গুরু, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এমনি সত্যবাদিতার জন্য ধন্য ধন্য পড়ে গেল। পুরো ক্রেডিট নিজে না নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেখানো পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার এই নজির সারাবিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টি করল।
নিন্দুকরা বলতে শুরু করল, 'দ্যাখো দ্যাখো, শালা শরিফ বদমাশ।' বদমায়েশি করে, আবার সত্য কথা বলে।
এদিকে স্তাবকরা বললেন, 'যুগে যুগে তুমি পাঠায়েছ দূত চুরেদের সংসারে, তাদের মোরা স্মরণ করি প্রেমের নমস্কারে।' এদিকে এত হই চইয়ের মাঝে সবাই বেচারা ভজ মিয়াদের কথা ভুলেই গেল। ভজ মিয়া একা ঘরে, একা এক সেলের মাঝে ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় আর মনে মনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলে- হে ঠাকুর, তুমি বাঙালিরে কী পথ দ্যেখাইলা যে, ওরা শর্টকাটে সব সমস্যার সমাধান করছে। আর ধামাধাম সব খুনিকে তোমার দেখানো পথে আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে বর্ডার পার হওয়ার আগেই ধরে ফেলছে। ভজ মিয়ার আঁধার জীবনে আর কারও ছায়া পড়ল না। সে এখন কেবল একা একা মনে মনে জীবনানন্দ দাশের কবিতা আওড়ায়- 'অদ্ভুত আঁধার এক, এসেছে, এ পৃথিবীতে আজ/যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশি আজ, চোখে দেখে তারা।/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই,/ পৃথিবী অচল আজ, তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।'
জাঁ-নেসার ওসমান: রম্য লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- জাঁ-নেসার ওসমান