ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

মানবসম্পদ

শিক্ষা খাতে পরিকল্পনাহীনতার খেসারত

শিক্ষা খাতে পরিকল্পনাহীনতার খেসারত
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২২ | ১৭:১৯

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও দেশে মানবসম্পদ পরিকল্পনা করা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতিও এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয় না। মানবসম্পদ পরিকল্পনার অভাব ও জাতীয় শিক্ষানীতির ভূমিকা না থাকায় আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটার হযবরল অবস্থা। কেউ বলতে পারে না দেশে কোন পেশার কত জনবল প্রয়োজন। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই বেহিসাবি সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। সংবিধান বা শিক্ষানীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাণিজ্যিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এখানে শিক্ষার মানের কোনো প্রশ্ন নেই।

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি ৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১০৬টি। এ ছাড়া প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। সরকারের কাছে দাবি নিবেদিত আছে চামড়া বিশ্ববিদ্যালয়, আইন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আরও বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। দেশের জনগণের মঙ্গল চিন্তায় আরও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হতে হবে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সর্বক্ষেত্রেই যোগ্যতাসম্পন্ন-মানসম্পন্ন শিক্ষক সংকটে ভুগছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি লক্ষণীয়। প্রাথমিক শিক্ষার যেসব সূচক আছে তা পূর্ণাঙ্গভাবে ২০ ভাগ শিক্ষার্থীও অর্জনে ব্যর্থ। আর এই মানহীন প্রাথমিক শিক্ষা থেকে যারা উচ্চশিক্ষায় যাচ্ছে তারা মানসম্পন্ন হবে তা কীভাবে আশা করা যায়? সর্বাগ্রে প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্পন্ন করার উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণ সংকট, উপকরণ সংকট ইত্যাদি সংকট নিরসনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ এখনও শুধু কথার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ। পরিকল্পনাহীন উচ্চশিক্ষাও এসব সংকটের বাইরে নেই। বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদানের শিক্ষক সংখ্যা, পরীক্ষাগার, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার সংকট বিরাজমান। এসব সংকটের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসছে তাদের কাছে মান খোঁজ করতে যাওয়া স্বাভাবিক হতে পারে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই যে শুধু এ সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে তা নয়, আমাদের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সংকটের মধ্যে আছে।

দেশের শিক্ষানীতিতে আছে, 'যে কোনো চাকরির জন্য স্নাতক সম্মান সর্বোচ্চ সনদ বিবেচিত হবে। শুধু শিক্ষকতা ও গবেষণার জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।' শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি শিক্ষানীতির এ সুপারিশটা পড়ে থাকে তবে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতে পারে, দেশে এত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের ব্যবস্থা কেন করা হয়েছে? দেশের কোন প্রয়োজনে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এবং কেন তা এখনও চলমান। লাখ লাখ শিক্ষার্থী শহরে এসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য জীবনপাত করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেমন জানে না দেশে শিক্ষকতা এবং গবেষণার জন্য কতজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রয়োজন, ঠিক তেমনি অনেক শিক্ষার্থী বা অভিভাবকও তাদের ভবিষ্যৎ নিশানা জানেন না। এই শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থের পাশাপাশি সামাজিক অর্থও নষ্ট হচ্ছে। তাতে দেশ, জাতি, ব্যক্তি কারও উপকার হচ্ছে কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোটাই ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষাকে মানসম্মত করতে হলে প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষাকে সর্বপ্রথমে মানসম্মত করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মানবসম্পদ পরিকল্পনা করতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশের মেধাবী সন্তানদের বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না করায় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষায় পরিকল্পিত স্নাতকোত্তর শিক্ষার ব্যয় সংযুক্ত করা হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান কিছুটা হলেও বাড়ত। গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত না করে আমরা কীভাবে এর পরবর্তী স্তরের গুণগত মান আশা করি? একই সঙ্গে এও জানা জরুরি, দেশে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব মেটাতে কতজন বিদেশি এখানে কর্মরত আছেন, স্বপ্ন কিংবা শুধু কথার মধ্যেই যদি এই শিক্ষাব্যবস্থাই চলমান থাকে, তাহলে ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের কাতারে নাম লেখানোর আমাদের স্বপ্ন পরিসংখ্যানের মধ্যেই থেকে যাবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়ে গেছে। ভাষা সংগ্রামের পর আমরা ৭০ বছর পার করে ফেলেছি। এখনও আমাদের ভাষাজ্ঞান কাঙ্ক্ষিত মানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। ফলে বিষয়জ্ঞান অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে নূ্যনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে। দেশে ১৬০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার পরও বিদেশনির্ভরতা কাটল না। মেগা প্রকল্পের কথা যদি বাদ রেখেও বলতে হয় অন্য অনেক প্রকল্পেই ভুলের সমাহার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়ার উদ্যোগ দেখাই যায় না। দিনে দিনে শিক্ষার্থীরা মৌলিক পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে ভুলে গেছে। বিশ্বের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে মাতৃভাষায় অনুবাদ করে শিক্ষার্থীদের সামনে হাজির করা আজও সম্ভব হয়নি। মনে হয় যেন দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বপ্নে পাওয়া ব্যবস্থাপনা এগিয়ে চলেছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে- স্বাধীনতার শতবর্ষ পালনের সময়ও শিক্ষাব্যবস্থা কি পরিকল্পনাহীনই থেকে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি কি অধরা থেকে যাবে? মানবসম্পদ পরিকল্পনা করে উচ্চশিক্ষিত বেকার সৃষ্টির পথ কি বন্ধ হবে না? বিশ্বের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কি সম্পৃক্ত করা যাবে না? সংবিধান ও শিক্ষানীতি অনুসরণে শিক্ষাব্যবস্থা কি গড়ে তোলা যাবে না? সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, আত্মত্যাগের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ নিশ্চিতভাবেই প্রেরণা সৃষ্টি করবে- যখন পরিসংখ্যানে নয় প্রকৃত বিবেচনাতেই বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে রোল মডেল হবে।

এম আর খায়রুল উমাম: প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]

আরও পড়ুন

×