ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

একটি ন্যায্য প্রতিবাদের সমর্থনে

একটি ন্যায্য প্রতিবাদের সমর্থনে
×

হারুন হাবীব

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২২ | ১২:০০

জুলাই মাসের ৭ তারিখ থেকে মহিউদ্দিন রনি নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড ধরে, গলায় ও হাতে শিকল বেঁধে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে অবস্থান ধর্মঘট করছেন। 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে' গান গেয়ে নিজের দাবিনামার সমর্থনে তিনি শান্তিপূর্ণ অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে ১৯ জুলাই কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রেলের সদরদপ্তর রেলভবন পর্যন্ত লংমার্চ করে মহাপরিচালকের হাতে স্মারকলিপি তুলে দিয়েছেন।
যত সহজে লিখলাম, বিষয়টি তত সহজ ছিল না। তিনি একা এবং একাকী দিনের পর দিন কমলাপুর রেলের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে; নানা সংকট, বিদ্রুপ ও নিরাপত্তাহীনতাকে পাশ কাটিয়ে তাঁর প্রতিবাদের ভাষা প্রচার করেছেন। টিভির খবরে আমি তাঁর বক্তব্য শুনেছি। সে বক্তব্যে কোনো রাজনীতি নেই; আছে রেলের অব্যবস্থা দূর করার প্রত্যয়। সাম্প্রতিক ঈদের আগে অনলাইনে টিকিট কাটা নিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন রনি। বলেছেন, কীভাবে এক শ্রেণির অসৎ রেলকর্মী ও দুর্নীতিবাজের কারসাজিতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে এবং তা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। অতএব, জেদি ছেলেটি নিজের থেকে দাবি প্রণয়ন করেছেন। সেই দাবি বুকে ধরে জুলাই মাসের পহেলা সপ্তাহ থেকে অত্যাশ্চর্য এক অবস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। এই যুবকের প্রত্যয় এতটাই দৃঢ়; ঈদের দিনেও তিনি রেলস্টেশনে কাটিয়েছেন।
একদিক থেকে দেখলে এই যুবকের প্রতিবাদটি বেশিরভাগ ট্রেনযাত্রীরই প্রতিবাদ। কারণ, সবাই কমবেশি ভুক্তভোগী এবং সবাই চান রেলের ব্যবস্থাপনা সুচারু হোক; অব্যবস্থা দূর হোক; সাধারণ মানুষের নিরাপদ গণপরিবহন হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করুক। লক্ষ্য করেছি, নানা সংবাদমাধ্যম এই একক কণ্ঠের দৃঢ়প্রত্যয়ী বক্তব্য প্রচার করেছে। বড় সংগঠক না হলেও বেশ কয়েকজন এই যুবকের শান্তিপূর্ণ এবং অভিনব প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন।
প্রথমে ভেবেছিলাম, মহিউদ্দিন রনির একক আন্দোলন দিন কয়েকের মধ্যেই স্তিমিত হবে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এমনই মানসিক দৃঢ়; তিনি প্রায় নিশ্চিত- একদিন না একদিন তাঁর আন্দোলন সফল হবে; 'সিস্টেম' বা প্রচলিত ব্যবস্থা বদলাতে বাধ্য হবে!
বলতে দ্বিধা নেই, 'সিস্টেম' বা প্রচলিত ব্যবস্থা বদলানোর দৃঢ় প্রত্যয়ী এই আশাবাদ আপাত যতটাই অবাস্তব মনে হোক না কেন; সেই স্বপ্ন দেখা আমার মতো বয়োবৃদ্ধ একজনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাঁর ছয় দফার অন্যতম দাবি হচ্ছে - ১. টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সহজ ডটকম কর্তৃক যাত্রী হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। হয়রানির ঘটনায় তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২. যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধ করতে হবে। ৩. অনলাইন কোটায় টিকিট ব্লক করা বা বুক করা বন্ধ করতে হবে; একই সঙ্গে অনলাইন-অফলাইনে টিকিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ৪. যাত্রী চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ রেলের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ৫. ট্রেন টিকিট পরীক্ষক, তত্ত্বাবধায়কসহ অন্য দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড সার্বক্ষণিক মনিটর, শক্তিশালী তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে রেলসেবার মান বৃদ্ধি করতে হবে। ৬. ট্রেনে ন্যায্য দামে খাবার বিক্রি, বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।


খারাপ বা মন্দ যে কোনো সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস সবাই রাখেন না এবং সেই সিস্টেমকে বদলানোও খুব সহজ কাজ নয়। কিন্তু মহিউদ্দিন রনি সেই কঠিন কাজটিই করেছেন। অতএব, আমি নিশ্চিত- এই সমাজের বহু সংগঠকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। আরও কারণ, যে দাবিগুলো তিনি উপস্থাপন করেছেন, এর প্রায় সবই ভুক্তভোগী মানুষের দাবি। অতএব, রেল প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে, সব না হোক, বেশিরভাগই মেনে নেওয়া সম্ভব।
এবার পুরোনো কথা বলি। সে সময় আজকের মতো প্রায় অনেক ঘরেই মোটরগাড়ি ছিল না। মানুষের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না; বাসও ছিল না সে রকম। দূরতম গন্তব্যে যেতে একমাত্র অবলম্বন ছিল তখন রেলগাড়ি। মনে পড়ে, গত শতকের ষাটের দশকে দেওয়ানগঞ্জের প্রদ্যুৎনগর স্টেশন থেকে দ্রুতযান ট্রেনে চেপে প্রথমবার ঢাকা এসেছিলাম গুলিস্তান সিনেমা হলে 'রূপবান' ছবি দেখতে। এর পর কলেজ-বিশ্বদ্যিালয়ে পড়তে গিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় যাতায়াত করতে রেলওয়েই ছিল একমাত্র বাহন। যদিও তখন আসন নির্ধারণের সুযোগ ছিল না। ভিড় ঠেলেই উঠতে-নামতে হতো। এর পরও ট্রেন ছিল অপরিহার্য গণপরিবহন। ক্রমে অবশ্য বাস সার্ভিসের উন্নতি হয়েছে। জামালপুর থেকে টাঙ্গাইলের মধ্য দিয়ে ঢাকায় এসেছি।
আশির দশক থেকেই রেলের চরম অবনতি শুরু হলো। মুনাফা বিবেচনায় ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা জাঁকিয়ে বসল। ফলে নতুন বাস যেমন রাস্তায় নামল তেমনি পুরোনো বাসগুলোতে রং লাগিয়ে গণপরিবহনে নতুন মাত্রা যোগ হলো। এতে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি ঘটল। যাত্রীসেবা যা-ই হোক না কেন, বাস ছাড়া কারও গত্যন্তর থাকল না। এতে রেলের গুরুত্ব কমতে থাকল কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবেই কমানো হলো। এমন একটা সময় এলো যখন ট্রেনের ইঞ্জিন ও বগিগুলো জিরজিরে হয়ে পড়ল। অব্যবস্থাপনার মাত্রা চরম আকার ধারণ করল। অথচ বিশ্বের প্রায় সব দেশ সে কারণেই রেলওয়ের উন্নতি ঘটিয়েছে। দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়েছে ট্রেন; বেড়েছে ট্রেনের সংখ্যা এবং যাত্রীসেবা।
অস্বীকারের উপায় নেই, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার রেলওয়ের উন্নয়নে নজর দিয়েছে। নতুন বগি এসেছে ট্রেনের; সেই সঙ্গে নতুন ইঞ্জিন। লাইনের সংস্কার হয়েছে; নতুন নতুন আন্তঃনগর ট্রেনও চালু হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মিত হওয়ায় উত্তরবঙ্গের সঙ্গে গণপরিবহনের অন্যতম বাহন হয়ে উঠেছে ট্রেন। যাঁরা বাসে চাপছেন, তাঁরা নিজেদের ইচ্ছা বা প্রয়োজনেই চাপছেন। কিন্তু অনেকেই বাস ছেড়ে ট্রেনে যাচ্ছেন। এখন ঢাকা থেকে ট্রেনে পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, পঞ্চগড় পৌঁছা যায়। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনার দিকেও ট্রেনের সংখ্যা বেড়েছে আগের যে কোনো সময়ের চাইতে। ময়মনসিংহ, জামালপুরের দিকে যদিও তেমনটা উন্নতি ঘটেনি, কিন্তু সার্বিকভাবে আগের বিপন্নতা কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। অতি সম্প্রতি আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রেনে চেপেছি। বলা বাহুল্য, যাত্রীসেবার কিছু সংকট বাদ দিলে সেই ট্রেনযাত্রাকে আমি মন্দ বলতে পারিনি।
বিগত এক দশকে, বলতেই হবে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ গণসেবার খাতগুলো ডিজিটাল হয়েছে। এতে শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তর সুবিধা হয়েছে। ট্রেনের টিকিট এখন অনলাইনে কাটা যাচ্ছে, যদিও নানা কারসাজিতে রিটার্ন বা ফিরতি টিকিট এখনও দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু রেলমন্ত্রী এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা জানেন কিনা আমার জানা নেই; সেই অনলাইন টিকিট বিক্রির পদ্ধতিতেও অসৎ মানুষের কারসাজি ঢুকেছে। ফলে নানা কারসাজিতে দ্বিগুণ দামে টিকিট কালোবাজারিতে বিক্রি হচ্ছে! সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে, সরাসরি টিকিট কাউন্টার থেকে যাঁরা টিকিট কিনতে যান, তাঁদের হেনস্তার কথা কম বলাই ভালো! যাঁদের ভাগ্য ভালো তাঁরা পেয়ে যাচ্ছেন 'সোনার হরিণ'। কিন্তু বেশিরভাগই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অসহায় হয়ে, অপমানিত হয়ে ঘরে ফিরছেন। বিশেষ করে ঈদ-পার্বণের আগে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে টিকিট পেতে হাজারো নারী-পুরুষের রাতজাগা ভয়ংকর যুদ্ধ এবং তাঁদের বিড়ম্বনার সকরুণ দৃশ্য সহ্য করা কঠিন।
এসব কারণেই আমি মহিউদ্দিন রনির দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি। জানি, তাঁর সব দাবি পূরণ রাতারাতি হবে না। এ জন্য সময় বা সিস্টেমের পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু অনলাইন বা অফলাইনে টিকিটের কালোবাজারি রোধ এবং ট্রেনের যাত্রীসেবার উন্নয়ন করা যবে না কোন যুক্তিতে? অতএব, যে অভিযোগ এই যুবক তুলেছেন, তা এড়িয়ে না গিয়ে জনস্বার্থ বিবেচনায় গুরুত্বসহকারে দেখার মধ্যে জনকল্যাণ আছে। সদিচ্ছা থাকলে উত্থাপিত বিষয়গুলো রেল কর্তৃপক্ষ নিঃসন্দেহে সমাধান করার প্রচেষ্টা নিতে পারেন।
হারুন হাবীব: মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক

আরও পড়ুন

×