শিক্ষক রাজনীতি
ব্যক্তিগত প্রাপ্তির নেশায় শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস
এম আর খায়রুল উমাম
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২২ | ১৪:১৬
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। একজন শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে শুনেছিলাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ সে সময়ই ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হতো। সেই শিক্ষা কর্মকর্তা মেধা আর দক্ষতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচনে উদ্যোগী হওয়ার পুরস্কার হিসেবে হাতে পান বদলির আদেশ। বর্তমানে তাই ধারণা করাই যায়, এসব পদের মূল্য অবধারিতভাবেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। ধরে নিই, বর্তমানে একজন অধ্যক্ষ ২৫ লাখ টাকায় পদ কিনেছেন। এখন ক্ষমতার সঙ্গে যুদ্ধে তিনি যদি পদ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে পরিবারের আভিজাত্যপূর্ণ জীবন গড়বেন কীভাবে? শুধু তাই নয়, তিনি যে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবেন, এটা তো জানা কথাই। অতএব, সবকিছু হারিয়ে সাধারণ জনগণের কাতারে শামিল হওয়ার চেয়ে আপস করা বুদ্ধিমানের কাজ। সাধারণ মানুষের ধারণা, সম্প্রতি রাজশাহীতে এমনটাই ঘটেছে, আর অন্য পেশাজীবীদের মতো শিক্ষকরাও যেহেতু রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত, তাই ঘটনার সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়েছে। সাধারণ মানুষ শিক্ষকের চোখের নিচে কালশিটে দেখতে পেয়েছে মাত্র, শরীরের ভেতরটা দেখতে পায়নি।
দেশে পদধারীদের দ্বারা এমন আদর করার রীতি নতুন নয়। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে এক শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো হয়েছিল। নড়াইলে এক কলেজ অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। কোনো ক্ষেত্রেই জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করছে এবং ঘটনাপরম্পরায় তারাও শিক্ষক লাঞ্ছনায় নিবেদিত হয়েছে। এতে শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। প্রতিকারের জন্য সামাজিক মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছে, কিন্তু সংশ্নিষ্ট কারও কান পর্যন্ত তা পৌঁছাচ্ছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতা দিন দিন এতটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে, কেউ কোনো বাধা মানতে চাচ্ছে না। ফলে ঘটনা শুধু শিক্ষক হেনস্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; যার ক্ষমতার দৌড় যতটা, সে ততদূর পর্যন্ত ছুটে চলেছে। শেষ পর্যন্ত কাউকে না পেলে নিজেরাই নিজেদের ওপর ক্ষমতা প্রদর্শনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
গ্রামবাংলায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, 'যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাবে না তা কেমন কথা।' আবার শুধু লাথি খেলেই চলবে না, লাথি খেয়ে হজমও করতে হবে। অবশ্য সবার হজমশক্তিও সমান নয়; কমবেশি হয়ে থাকে। যেমন- রাজশাহীতে অধ্যক্ষের সাত দিন সময় লেগেছে। সাত দিন পর তিনি সাংবাদিকদের সামনে এসে বলতে পেরেছেন সত্য কথাটা। শুধু তিনি নন; সাক্ষীরাও ছিল সেই দলে। পেটের দায়ে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোই শিক্ষা দিলেন অধ্যক্ষ। দেশের অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এখন এমন শিক্ষা গ্রহণ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তো একটি ঘটনা শুধু উপভোগ করেছেন তা নয়; আগামী দিনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, ক্ষমতাবানের ক্ষমতার দৌড় দেখেছেন, ক্ষমতার শক্তিকে উপলব্ধি করেছেন। সাধারণ জনগণও সব জানা-বোঝা শেষে ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার দাপট বুঝতে পেরেছে।
এত সব ঘটনা-দুর্ঘটনার(!) মধ্যে বাংলাদেশ যে এখন আর অ্যানালগ নেই, তা ভুলে গেলে চলবে? বর্তমান সরকার যে ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছে- এ কথা একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে অধ্যক্ষ এবং সরকারের অংশ হিসেবে নেতার স্মরণে থাকাটা খুব প্রয়োজন। আজ আর অতীতে একবার বলে ফেলা কথা বা করে ফেলা কাজ অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশে কোথাও না কোথাও কোনোভাবে সে কথা বা কাজের সত্যতা থেকেই যায়। তাই তো সব ঘটনা অধ্যক্ষ বা নেতা সংবাদ সম্মেলন করে অস্বীকার করার পরও সব প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ঠিকই প্রচারিত হয়ে চলেছে। যদিও ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষের জন্য এসব প্রমাণ কোনো ব্যাপার নয়; তাঁরা সত্যের পূজারি, দেশ ও জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করে জনগণের কল্যাণে জীবনপাত করে চলেছেন। আর এসব ঘটনা জনকল্যাণে করতেই হয়। তাই চিৎকার করে, প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হবে না। সাধারণ মানুষ জানে, আজ পর্যন্ত দেশের কোনো তদন্ত কমিটি ক্ষমতাবানদের কোনো ভুল খুঁজে পায়নি। এবারও আশা করা যায়, এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে সব জায়গায় সাক্ষীদের হাজিরা এমন বিশ্বাসের নিশ্চয়তা দেয়।
বাংলাদেশের পেশাজীবী সমাজ রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সব পেশাজীবীর কাছেই তাই পেশার উন্নয়নের চেয়ে রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিজের প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এ পথের বিকল্প কিছু আছে, তা এসব পেশাজীবী বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না। তাই দলের প্রতি কে কতটা অনুগত, সেই প্রতিযোগিতা চলে সর্বক্ষণ এবং সর্বক্ষেত্রে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রতিযোগিতা প্রদর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র। এখানে দলের পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি মতাদর্শে বিশ্বাসীদের সহায়তার ঘটনাও দৃশ্যমান। এসবের বিকল্প এখনও দেখা যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পেতে হলে অর্থের সঙ্গে দলের আশীর্বাদ প্রয়োজন পড়ে। সেখানে পেশার দক্ষতা, যোগ্যতা এবং মেধা কোনো বিবেচ্য নয়; আর যেখানে মেধার মূল্যায়ন হয় না, সেখানে কোনো নৈতিক জোর থাকে না, বুকে কোনো সাহস থাকে না। একজন মানুষ যার নৈতিক শক্তি নেই, বুকে সাহস নেই- সে কীভাবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে? দল মানলে সে দলের নেতাকেও তো মানতেই হবে। রাজশাহীর ঘটনাটাকে এভাবে বিবেচনায় নিলে দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মানুষের আর প্রতিবাদ করতে হবে না।
সাধারণ জনগণ মনে করছেন, পেটের দায়ে শিক্ষকরা এসব সহ্য করে নিচ্ছেন। সত্যিই কি তাই? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশায় শিক্ষক সমাজের দায় খুব কম না। শিক্ষক সমাজ ব্যক্তিগত প্রাপ্তির লক্ষ্যে রাজনীতিতে ব্যস্ত সময় পার করতে গিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে গোটা জাতিকে একটা ভয়াবহ সংকটের মধ্যে ফেলেছেন। পেশার প্রতি আন্তরিক না হয়ে দলীয় মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে যে পরিবেশ তাঁরা সৃষ্টি করেছেন, সেই নরম জায়গায় বিড়াল তো আঁচড়াবেই।
এম আর খায়রুল উমাম :প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]
