ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাতের তাৎপর্য

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাতের তাৎপর্য
×

.

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ০৯:১০ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ০৯:১১

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছেলে রাহগীর আল মাহি সাদ এরশাদ এমপি। সমকাল অনলাইনে মঙ্গলবার প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরে গণভবনে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দ ৪০ মিনিটব্যাপী আলাপ-আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পরে এমন দৃশ্য বিরল বলা যায়। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং ক্ষমতার বাইরে প্রধান বিরোধী নেতা ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এই দুই রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ে এভাবে ঘরোয়া সাক্ষাৎ কিংবা আপ্যায়নের খবর জানা যায়নি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বর্তমান প্রধান বিরোধী দলের নেতার সাক্ষাৎকে তাই ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ আছে। বিশেষ করে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে মাঠের আন্দোলনে থাকা বিএনপি ১০ ডিসেম্বর প্রথম ধাপের আন্দোলন কর্মসূচি শেষ করল; দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ কেন্দ্রীয় নেতারা রয়েছেন কারাগারে; সংসদে থাকা বিএনপির সংসদ সদস্যরা যখন পদত্যাগ করল- এমন সময়ে এই সাক্ষাৎ বেশ ফজিলতপূর্ণ বলেই মনে হচ্ছে।
২০০৮ থেকে টানা ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এই সময়ে হয়েছে ২০১৪ এবং ২০১৮-এর নির্বাচন। ২০১৪-এর নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। সেই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছিল। এর পরে ২০১৮-এর নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছিল। তখন জাতীয় পার্টি ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জোটের অংশ। সেই নির্বাচনের পরেও দেখা গেল প্রধান বিরোধী দলের আসনে জাতীয় পার্টি। আরও অবাক হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার সময়ে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি মন্ত্রীর সমমর্যাদায় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটা ছিল অভূতপূর্ব। সম্ভবত বিশ্ব রাজনীতিতেও এমন উদাহরণ আর পাওয়া যাবে না।
এর আগে ২০১৪-এর নির্বাচন নিয়ে অবশ্য নানা নাটক হয়েছিল। এরশাদ বলেছিলেন, তাঁর দল জাতীয় পার্টি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। এর পরেই এরশাদের অসুস্থতার নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। এরশাদকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চিকিৎসার জন্য সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। এভাবে একজনকে অসুস্থ সাজিয়ে আরেক পক্ষ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেশের রাজনীতিতে বিরল উদাহরণ হিসেবেই থাকবে।
জাতীয় পার্টির বর্তমান যে নেতৃত্ব রয়েছে, তাঁদের বিবাদ শুরু হয় মূলত এরশাদের মৃত্যুর পরে। কে হবেন দলীয় প্রধান আর কে হবেন সংসদে বিরোধী দলের নেতা- এই সিদ্ধান্তের জন্য দলটি এর আগেও আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সালিশ মীমাংসা মেনে নিয়েছিল। অন্তত ছয় মাস ধরে জি এম কাদের 'সত্য কথা' বলে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। ওই সময়ে রওশন এরশাদ অসুস্থতা নিয়ে বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরই মাঝে জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতাকে বহিস্কার করেছিলেন জিএম কাদের। সেই বহিস্কারের আদেশ মেনে না নিয়ে আদালতের কাছে গিয়েছিলেন বহিস্কৃত নেতারা। আদালত বিষয়টি মীমাংসা করার দায়িত্ব নিয়ে জি এম কাদেরের পার্টি প্রধানের ক্ষমতায় লাগাম টানে। সেই থেকে জি এম কাদের প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেন না। আবার একই সময়ে রাজনীতিতে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার আলাপ এগিয়ে নিচ্ছেন জি এম কাদের, তাই থামাতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।
এমন সময়ে দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন রওশন এরশাদ। মাঠে থাকা বিএনপি ১০ ডিসেম্বরের ঢাকা সমাবেশ থেকে তাদের সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে। ১১ তারিখ তাঁরা পদত্যাগও করেছেন। যেহেতু সংসদের আনুষ্ঠানিক বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, এর পরে গুঞ্জন ওঠে জাতীয় পার্টিও পদত্যাগ করবে কিনা? এই আলোচনার মধ্যেই মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির পরিবারের তিন সদস্যের সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। এখানে আরও একটি বিষয় খেয়াল করার মতো, আগামীকাল বুধবার জাতীয় পার্টির প্রধানের দায়িত্ব-বিষয়ক আদালতের রায় আসার কথা। এই সময়ে এই সাক্ষাৎকে তাই তাৎপর্যপূর্ণ বলেই ধরা যায়।
জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে বিগত বছরে যে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে, তা হলো- জাতীয় পার্টি 'গৃহপালিত' বিরোধী দল। এখন এমন অভিযোগ মাথায় নিয়ে জাতীয় পার্টির তিন উত্তরাধিকারের সাক্ষাৎকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব তৈরি করতে পারে, তা দেখতে হলে অন্তত আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান কে থাকবেন, জাতীয় পার্টি সংসদে থাকবে কিনা- এমনসব প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে এই সাক্ষাতের তাৎপর্য জানা দরকার।

এহ্‌সান মাহমুদ : সহসম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×