ঢাকা শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাম পরিস্থিতি

সংক্রমণ বিস্তারে, সরকার বিশ্রামে?

সংক্রমণ বিস্তারে, সরকার বিশ্রামে?
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে হাম ব্যাধির বিস্তারের প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হইলেও উহার উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা হ্রাসের লক্ষণ নাই। বরং প্রায় প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান উদ্বেগ বৃদ্ধি করিয়া চলিয়াছে। সন্দেহ নাই, ব্যাধিটির বিস্তার ঘটিয়াছে সমগ্র দেশেই; যথায় মৃত্যুর সংখ্যা সহস্রাধিক অতিক্রান্ত। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০টি জেলায় হামের সংক্রমণের হার তুলনামূলক অধিক। ঢাকার শীর্ষ অবস্থানের পরই রহিয়াছে চট্টগ্রাম, বরিশাল, কক্সবাজার ও সিলেট। কিন্তু পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারি তৎপরতা যেন কেবল রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেই সীমিত রহিয়াছে। সংক্রমণ যখন বিস্তারিত, সমাধান তখন যেন বিশ্রামরত। আমাদের স্মরণে রহিয়াছে, গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচির সূচনাকালে সরকার হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনয়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করিলেও সংক্রমণ হ্রাস না পাইবার লক্ষণ খোদ টিকা কর্মসূচির কার্যকারিতা লইয়াই প্রশ্ন তুলিয়াছে।

সরকারের দাবি, ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করিয়া ১০৩ শতাংশ শিশুকে হামের টিকা প্রদান করা হইয়াছে। আমাদের সরল প্রশ্ন, উহার সুফল কেন মিলিতেছে না? অতীতে যেই কোনো ক্যাম্পেইনের পর সংক্রমণ দ্রুত হ্রাস পাইলেও এইবার উহার বিপরীত চিত্র কেন প্রত্যক্ষ করিতে হইতেছে? বস্তুত এই সংকটের সূচনালগ্ন হইতেই অবহেলা দৃশ্যমান। যথাসময়ে হামের টিকার  ব্যবস্থা না করিবার দায় অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের নিশ্চয়ই রহিয়াছে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার শুরুতেই হামকে মহামারি ঘোষণা করিয়া সমন্বিত ব্যবস্থা লইলে উহা নিয়ন্ত্রণ সহজ হইত। সরকার বিলম্বে হইলেও হামের টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করিতে উদ্যোগী হইয়াছে। ইতোমধ্যে ৫ বৎসর বয়সী সকল শিশুর জন্য এই টিকা কর্মসূচি পালন করিয়াছে। কিন্তু অঞ্চলভেদে অবস্থান অনুযায়ী চিকিৎসা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্পষ্টতই জোরদার হয় নাই। 
আমরা দেখিয়াছি, ইতোপূর্বে সমকালের প্রতিবেদনে সিলেটের পরিস্থিতি উঠিয়া আসিয়াছে। টিকা সংকট শুধু নহে; পুষ্টিহীনতার কারণেও তথায় শিশুর প্রাণহানি বৃদ্ধি পাইয়াছে। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত অত্র সম্পাদকীয় স্তম্ভে তখন আমরা লিখিয়াছিলাম, সমগ্র দেশে মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় সিলেটের অবস্থান দ্বিতীয় হইবার বিষয় কেবল সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নহে; বরং আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচি এবং শিশুপুষ্টি ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিফলন। যেই সকল শিশু নিয়মিত টিকা পায় নাই এবং পুষ্টিহীনতায় ভুগিতেছে, তাহাদের মধ্যেই হাম কিংবা উহার উপসর্গে মৃত্যু মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। ইহার অর্থ, পূর্বেই ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে এহেন মৃত্যু প্রতিরোধ করা যাইত। 

আমরা মনে করি, শিশুর মৃত্যু কেবল পরিবারের নয়, সমগ্র জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। হামের ন্যায় প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধিতে এইরূপে সহস্র শিশুর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না। স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত অধিকতর সংক্রমিত ১০টি জেলার পরিস্থিতি আমলে লইয়া স্থানানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং অভিভাবক– সকলের সমন্বিত উদ্যোগেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব। টিকার পূর্ণ সর্বাঙ্গীণতা এবং শিশুপুষ্টি নিশ্চিতকরণে ব্যর্থ হইলে ভবিষ্যতেও এমন করুণ মৃত্যুর মিছিল থামানো দুরূহ হইবে। স্মরণে রাখিতে হইবে, শুধু হাম নহে; ডেঙ্গুতেও শিশুদের মৃত্যুহার ক্রমবর্ধমান। উভয়ের প্রকোপ একসঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী হইলে বৃহৎ দুর্যোগে রূপ লইতে পারে। তজ্জন্য হাম প্রতিরোধে যদ্রূপ ব্যবস্থা লইতে হইবে, তদ্রূপ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও বিস্মৃত হইলে চলিবে না।
 

আরও পড়ুন

×