মতামত
দেশপ্রেম শুধু গানে আর পোশাকে সীমাবদ্ধ করছি কি?
ঞ্যোহ্লা মং
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৪:১৩ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৩ | ০৯:১৭
১৬ ডিসেম্বর ছায়ানটের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অনুষ্ঠিত বিজয় দিবসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে সপরিবার গিয়েছিলাম। প্রবেশপথে কিছুটা কড়াকড়ি পেরিয়ে গ্যালারিতে বসার জায়গা না পেয়ে একেবারে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছি। একের পর এক জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানে অনুষ্ঠানটি আরও একটু লম্বা হলে ভালো হতো কিনা এমন একটি সুন্দর অনুভূতির সঙ্গে বুকভরা গর্ব আর তৃপ্তি নিয়ে দর্শকদের ফিরে যেতে দেখেছি। আমি নিজেও অনেকদিন পর গোছালো সুশৃঙ্খল অনুষ্ঠান দেখে খুশি হয়েছি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ছিল না কোনো লম্বা বক্তৃতা, শেষেও ছিল না শেষ করার নামে নানা আনুষ্ঠানিকতা। অনুষ্ঠান শুরু ও শেষ হয়েছে একেবারে সময়ের কাঁটা ধরে। ফলে অনুষ্ঠান শুরু ও শেষটি ছিল গতানুগতিকতার বাইরে কিছুটা নতুনত্ব দিয়ে।
দেশের পতাকার লাল আর সবুজ রংসমৃদ্ধ অংশগ্রহণকারীদের পোশাক অনুষ্ঠানকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। মাঠভর্তি শিল্পীরা ভালোবাসা আর গর্বের গান দিয়ে বিজয় উদযাপন করেছেন; একইভাবে দর্শক গ্যালারিতে থাকা নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোররাও লাল-সবুজ রঙের পোশাক আর ছোট ছোট পতাকা নিয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছেন। গান, কবিতা আর স্লোগানের সঙ্গে দর্শকরাও কণ্ঠ মিলিয়েছেন। লাল-সবুজের ভালোবাসায় প্রত্যেকে মোবাইলে কিংবা ক্যামেরায় সুখস্মৃতি ধারণ করেছেন। বিশ্বাস করি, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় প্রত্যেকে দেশের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে নিজেদের ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে থাকবেন। মঞ্চকে ঘিরে শিল্পী আর আয়োজকদের মাঝে অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করার প্রচেষ্টা সবার নজর কেড়েছে। তবে দর্শক সারিতে থাকা অনেককে দেখে তারা শুধু জনপ্রিয় দেশাত্ববোধক গানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশের পাশাপাশি নিজেদের দেশের রঙে সাজিয়ে ছবি তোলার প্রবণতা থেকে অংশ নিতে এসেছিলেন কিনা এমন ভাবনা কাজ করেছে। কেননা অনুষ্ঠান শেষে দর্শক গ্যালারির দিকে আর তাকানো যাচ্ছিল না। তাঁরা যে যেভাবে পারেন নিজেদের বসার আসনগুলোকে বাদামের খোসা আর পুরোনো পত্রিকা দিয়ে ভরে অনুষ্ঠানস্থল ছেড়েছেন।
একজন পরিবেশ কর্মী হিসেবে দর্শকদের দেশের প্রতি এহেন ভালোবাসা দেখে কষ্ট পেয়েছি। যাঁরা দেখতে গিয়েছেন সবাই উচ্চ শিক্ষিত- কেউ সংস্কৃতিকর্মী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী।
আমাদের দেশপ্রেমের নমুনা এখনও গানে, কবিতায়, পোশাকেই রয়ে গেছে। আমাদের আচরণে দেশপ্রেম দেখাতে পারিনি। কিংবা আমাদের দৈনন্দিন আচরণে দেশপ্রেম দেখানোর গুরুত্ব উপলব্ধি অনুভব করতে পারিনি।
প্রশ্ন করতে পারি, দিবসনির্ভর দেশপ্রেম দিয়ে আমরা কি খুব বেশিদূর যেতে পারব? বিশ্বকাপ চলাকালীন জাপানি দর্শকদের পরিবেশ সচেতনতা দেখে আমরা পুলকিত হই মাত্র। তাদের আচরণের প্রশংসা করলেও নিজেদের সংশোধন করার প্রয়োজনবোধ করি না।
একটি মুক্ত স্বাধীন দেশের স্বাদ পাওয়ার আনন্দ আয়োজনে অংশ নিতে গিয়ে কেন দেশকে, পরিবেশকে নোংরা করব? আমাদের আনন্দ আয়োজন কেন ঝাড়ূদারদের কাজ বাড়াবে? আমাদের দেশপ্রেম নিয়ে ঝাড়ূদাররা যদি কোনো প্রশ্ন তোলেন, উত্তর দিতে পারব কি?
ঝাড়ূদার আছে বলেই কি আমরা ময়লা করতে থাকব? ঝাড়ূদারের কাজ কমানো কিংবা দেশকে ঝাড়ূদারবিহীন করার স্বপ্ন কেন দেশপ্রেমের অংশ হবে না? আমরা যখন-তখন, যেখানে-সেখানে ময়লা করতে থাকব আর ঝাড়ূদাররা ঝাড়ূ দিতে থাকবেন, এ কেমন চিন্তা! এ কেমন দেশপ্রেম? এ আমাদের কেমন বিজয় দিবস পালনে অংশগ্রহণ?
আমাদের দেশপ্রেমকে এখনও গানে, পতাকায়, পোশাকে কিংবা দিবস উদযাপনে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি। শত শত বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও তার ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশ সচেতন হতে শিক্ষা দিতে পারেননি। লাখো কোটি তরুণ শিক্ষিতের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সারা শহরকে প্রতিনিয়ত নানাভাবে নোংরা করে চলেছে। বসবাসের অনুপযোগী করে চলেছে। আমরা যেমন পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা শিখতে পারিনি, তরুণ প্রজন্মকেও তা শেখাতে পারিনি। দেশপ্রেম নিয়ে ভাবনার পরিসর বাড়ানো না গেলে দেশে ঝাড়ূদারের সংখ্যা হয়তো বাড়বে, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ পাব না। জাপানি ফুটবল দর্শকদের প্রশংসা করলে হবে না, তাঁদের দেখাদেখি আমাদেরও শেখার, চর্চা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
- বিষয় :
- দেশপ্রেম
- পরিবেশ সুরক্ষা
