ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আধ্যাত্মিকতা

সংযমের অন্তর্নিহিত সত্য-স্বরূপ

সংযমের অন্তর্নিহিত সত্য-স্বরূপ
×

আনিস আহমেদ

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০

মুসলমানদের কাছে পবিত্র এই রমজান মাসকে প্রায়ই খুব সরল দৃষ্টিতে দেখা হয়। উদয়াস্ত পানাহার ও ভোগবিলাস থেকে বিরত থাকাকে এতটাই প্রাধান্য দেওয়া হয়, বস্তুত সংযম পালন একটি সরলরৈখিক বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন এই সংযমের আনুষ্ঠানিক পালন– এমন একটা প্রশ্নের জবাব তো সহজ; বছরের এই একটি মাস রোজা পালন খোদার সন্তুষ্টির জন্য। আর খোদার এই সন্তুষ্টি তাঁর বান্দাদের জন্য একান্তই প্রয়োজন। কারণ আল্লাহ (খোদা শব্দটা অনেকেই ইদানীং পরিহার করে চলেন, যদিও আমার দৃষ্টিতে খোদা যিনি তিনিই আল্লাহ) সন্তুষ্ট হলেই তিনি পরকালে আমাদের জান্নাতে পাঠাবেন, নইলে আমরা জাহান্নামের আগুনে পুড়ে মরব। তার মানে, আমাদের রোজা রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হলো জান্নাতপ্রাপ্তির বাসনা এবং জাহান্নাম থেকে রেহাই পাওয়া।

একটু বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, প্রাপ্তির লোভ থেকে মুক্ত নই আমরা বোধ হয় এই সংযমের মাসেও। অনেকেই হয়তো বলবেন, এতে তো বস্তুগত কোনো লোভ নেই; ইহলৌকিক কোনো ব্যাপারও নেই; পুরো বিষয়ই তো পারলৌকিক। তাহলে এ প্রাপ্তি লাভে আপত্তি কোথায়! আপত্তিটা আসলে এই যে, বেহেশতে যে প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে, তা পারলৌকিক হলেও তার বর্ণনা একেবারেই বস্তুগত। কখনও সেখানে সুস্বাদু খাদ্যের কথা বলা হয়েছে, কোথাও সুন্দরী হুর-পরিদের কথা আছে। অর্থাৎ সব দৃষ্টান্তই বস্তুগত।

আসলে কোরআন শরিফে ব্যক্ত শব্দগুলো অনেকটাই প্রতীকী এবং উপমাধর্মী। মানুষের কাছে যা পরিচিত, সহজেই বোধগম্য এমন শব্দই ব্যবহার করা হয়েছে মুসলমানদের এই পবিত্র গ্রন্থে। তবে গোটা বিষয় যে প্রতীকী– সেই সত্য অনুধাবনে আমরা ব্যর্থ হই। তাই সংযম পালনের লক্ষ্যও হয়ে দাঁড়ায় পরলোকে ইহলোকের মতো পরম সুখপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘আইরনি’ বা পরিহাস– সে রকম বিষয় এটা। সংযম যদি হয় রমজানের মুখ্য বিষয়, তাহলে প্রাপ্তিযোগের লোভে কেন আমরা আল্লাহকে খুশি করতে চাই।

এখানেই সুফিবাদের প্রসঙ্গটি আসে। সুফিবাদ খোদার প্রতি মানুষের একটা নিঃশর্ত এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে তুলে ধরে। স্মরণ করা যেতে পারে হজরত রাবেয়া বসরির কথা; যিনি আল্লাহর প্রতি ভালোবেসে বলেছিলেন, তিনি যদি জাহান্নামের ভয়ে এবং বেহেশতের লোভে নামাজ পড়ে থাকেন, তাহলে আল্লাহ তাঁকে যেন জাহান্নামেই পাঠান। এই দুঃসাহসী কথা শুনে আজকালকার হুজুররা তাঁকে ধর্মবিরোধী মনে করতেই পারেন, বিশেষত যাঁরা সুফিবাদের প্রতি বরাবর অনীহা প্রকাশ করে এসেছেন। তবে হজরত রাবেয়া বসরি এমন কথা বলতে পেরেছিলেন, কারণ আল্লাহর প্রতি তাঁর ভালোবাসার মধ্যে কোনো খাদ ছিল না। ভালোবাসার বিনিময়ে তিনি অন্য কিছু চাননি। তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী সুফি।

আমরা যারা নিতান্তই সাধারণ খোদাভীরু মানুষ তারা আল্লাহর কাছে নিজেদের ভুল কর্মের জন্য নিত্য ক্ষমা চাই এবং চাই যে তিনি যেন আমাদের পরকালে পুরস্কৃত করেন। এই চাওয়ায় ভুল নেই। আল্লাহও চেয়েছেন মানুষ তার অপরাধের জন্য কেবল তাঁর কাছেই ক্ষমাপ্রার্থী হোক। কারণ তিনি ইহকাল ও পরকালের একমাত্র মালিক। আমরা এই সহজ-সরল পথ ধরেই এগোতে চাই বরাবর। কিন্তু অন্তর্গত সত্য তো এও– কেবল মানুষ নয়; আল্লাহ তাঁর সব সৃষ্টিকেই ভালোবাসেন। ভালোবাসেন বলেই তো তিনি আমাদের এত কিছু দিয়েছেন। এখানে তো আল্লাহর কোনো স্বার্থ নেই; তিনি ভালোবাসেন কারণ আমরা তাঁরই সৃষ্টি। সেখানেই উঠে আসে এই গভীর দার্শনিক প্রশ্ন– তিনি যদি আমাদের ভালোবাসেন, তাহলে আমরা কেন ভালোবাসব না তাঁকে। আর ভালোই যদি বাসি তাহলে তো সম্পর্কটা হতে হবে চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে; নির্ভেজাল ভালোবাসায় পরিপূর্ণ, একেবারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে– নিরাকার কাউকে ভালোবাসা যায় কীভাবে, যিনি মূর্তমান নন, বিমূর্ত একেবারে! আর সেখানেই আসে সৃষ্টিকে ভালোবাসার প্রশ্ন। সৃষ্টি মূর্তমান, সৃষ্টিকে ভালোবাসলে স্রষ্টা স্বয়ং খুশি হন।

প্রকৃত সত্যটা হলো, সব সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টা আছেন লুকিয়ে। সুফিবাদের এই কথাটাও উপলব্ধি করতে হবে। অনেকেই আবার এ নিয়ে আপত্তি করেন অথচ মানেন, সব সৃষ্টিই আল্লাহর তৈরি। অথচ আল্লাহ যে সৃষ্টির ভেতরেই রয়েছেন– সে কথা উপলব্ধি করতে চান না। ভাবেন এটা বোধ হয় ঠিক নয়– স্রষ্টা আর সৃষ্টিকে অভিন্নভাবে দেখা। অথচ আমরা কি ভুলে গেছি, আল্লাহ মাটি দিয়ে প্রথম মানুষ হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেন; তারপর ফেরেশতা ইবলিশকে বলেন হজরত আদম (আ.) কে সেজদা করতে। ইবলিশ আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন এবং সে চিরকালের জন্য শয়তানে পরিণত হয়।

একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে– আল্লাহ যখন বলছেন, তাঁকে ছাড়া আর কাউকে সেজদা করা যাবে না, তখন শয়তানকে কেন বললেন মাটির পুতুলকে সেজদা করতে! বাহ্যত মনে হতে পারে, আল্লাহ যেন নিজের নির্দেশ নিজেই অমান্য করছেন। বিষয়টা তা নয়। কিন্তু ওই আদমের মধ্যে আল্লাহ নিজেই লুকিয়ে আছেন– সে কথাটা সেদিন ইবলিশ যেমন বোঝেনি, আজকাল আমরাও তেমনি বুঝি না। এর অর্থ এই নয় যে, মাটির মানুষকে কুর্নিশ করতে হবে। সেটা প্রতীকী। বাস্তব সত্যটা হচ্ছে, প্রত্যেক মানুষকে সম্মান করতে হবে, ভালোবাসতে হবে।

আজকাল প্রায়ই আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখানো হয়; এমনকি মাদ্রাসার সরলপ্রাণ ছোট শিশুদেরও। যে শিশুরা জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত, তাদের পরকালের ভয় দেখানো হয়। অথচ আল্লাহ যে দয়াময়; তিনি যে মানুষসহ তাঁর সব সৃষ্টিকে ভালোবাসেন– সেই সত্যটা সহজে তুলে ধরেন না এখনকার মৌলবিরা। বলেন না কখনোই, মূর্তমান মানুষকে ভালোবাসলে বিমূর্ত আল্লাহকে ভালোবাসা হয়। আর ভয় নয়; ভালোবাসা দিয়ে আল্লাহকে পেতে হবে। আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর আদেশমতো সংযম সাধনা করলেই সে সংযম পালন অর্থবহ হতে পারে। কিছু প্রাপ্তির আশায় তা ইহলৌকিক হোক, কিংবা পারলৌকিক; তাতে সংযম হয় না। কেবল স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে ভালোবাসলেই সব ইবাদত সার্থক হয়।

আনিস আহমেদ: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক

আরও পড়ুন

×