অন্যদৃষ্টি
উদ্যোক্তা তৈরির শিক্ষা
মুহাম্মদ ইয়াসীন ইবনে মাসুদ
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৩ | ২২:১৮
আয়তনে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে ৯০তম হলেও বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। ফলে জিডিপির আকৃতিতে বিশ্বে ৩২তম হলেও এ দেশের মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ খুব আশাজাগানিয়া নয়। বিপুলসংখ্যক মানুষের মানসম্মত কর্মসংস্থান করা সম্ভব হচ্ছে না বাংলাদেশের পক্ষে। ফলে প্রতি বছর কয়েক লাখ লোক বেকার থাকছে।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মে সম্পৃক্তি একমাত্র স্বকর্মসংস্থানের মাধ্যমেই সম্ভব। এটি আবার উদ্যোগী জনগণের মধ্য থেকেই হতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের কার্যকর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়া হয় না। কর্মমুখী শিক্ষা দেওয়ার জন্য দেশে বেশ কিছু কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং সেগুলো কর্মমুখী শিক্ষা দিচ্ছেও। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে না এবং তার জন্য অনুপ্রাণিতও করছে না। সবাই চাকরির বাজারের কথা বিবেচনায় রাখছে। শিক্ষার্থীরাও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর জীবনের মূল্যবান প্রায় ছয় বছর চাকরি খোঁজার জন্যই ব্যয় করছেন।
যাঁদের আমরা ব্যবসায় বিষয়ে শিক্ষা দিচ্ছি, তাঁদেরও মূলত চাকরির বাজারের জন্যই প্রস্তুত করছি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়নবিষয়ক কোর্স পড়ানো হচ্ছে। এতে মূলত কিছু বিখ্যাত উদ্যোক্তার গল্প এবং সঙ্গে কিছু তাত্ত্বিক বিষয় পড়ানো হয়। হাতে-কলমে শেখার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে এটিও ছাত্রদের উদ্যোক্তা হতে সহায়তা বা অনুপ্রাণিত করতে পারে না। উদ্যোক্তা তৈরি না হওয়ার কারণে যে গতিতে বেকারত্ব বাড়ে; বেশি বেশি উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে বেকারত্ব তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে কমবে। কারণ বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই নিজের সঙ্গে অনেকের কর্মসংস্থান করেন। তাই উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে।
এ উদ্দেশ্যে যা করা যেতে পারে:
১. প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের পৃথিবীর বিভিন্ন সফল উদ্যোক্তার জীবনসংগ্রাম ও সফলতার গল্প শোনাতে হবে। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই তারা উদ্যোক্তা হওয়াকে অন্যান্য পেশার একটি বিকল্প হিসেবে ভাবতে শিখবে। ২. বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে ব্যবসায়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এতে কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসায়ের জ্ঞানের সংযোগ এবং যৌথ বিভিন্ন উদ্যোগের ধারণা তৈরি হবে। এভাবে যে উদ্যোগগুলো আসবে সেসব বাস্তবায়নে সরকারিভাবে সুদ ও জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
৩. বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হতে সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠান থেকেও সুদবিহীন ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। স্নাতক পর্যায়ের শেষদিকে যে কোনো একটি সেমিস্টারে এ ঋণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। যাদের ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা আছে, তাদের এর বিকল্প হিসেবেও স্ব-উদ্যোগকে রাখা যেতে পারে। ৪. প্রতি বছর ছাত্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তাদের পুরস্কার ও স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. যাদের কাছে ভালো উদ্যোগের ধারণা আছে, তাদের সঙ্গে করপোরেট দুনিয়ার যোগাযোগ স্থাপনে প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। এতে অনেকের মূলধনের সমস্যা দূর হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কোনো দেশ এগুলো করেছে? উত্তর হলো, অনেক দেশেই এভাবে হয়েছে। এ ছাড়া অন্য দেশ না করলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই পন্থায় যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় কি আছে? আসলে সব সময় অন্য দেশকে অনুকরণ না করে নিজস্ব পন্থায় নিজস্ব ধরনের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
মুহাম্মদ ইয়াসীন ইবনে মাসুদ: শিক্ষক, হিসাববিজ্ঞান
