ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নৌ যো গা যো গ

‘মফস্বল’ সন্দ্বীপ-হাতিয়া ‘সদর’ হবে কবে?

‘মফস্বল’ সন্দ্বীপ-হাতিয়া ‘সদর’ হবে কবে?
×

গওহার নঈম ওয়ারা

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৩ | ০৯:৩১

ঈদ করতে গিয়ে হাজিরার আসামি

 ঈদের ছুটিতে ঘরে ফিরতে গত ২৮ জুন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সন্দ্বীপের কর্মজীবী, ছাত্রছাত্রী ভোর ৪টা থেকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা ঘাটে জড়ো হয়েছিল। স্টিমারের টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এক দুই করে ১২ ঘণ্টা পার হয়ে যায়; বাড়িমুখো মানুষের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে পা ফেলার জায়গাও আর থাকে না। কিন্তু টিকিট মিলছিল না। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান পত্রিকান্তরে লিখেছেন, ‘সকালে একটা শিপ ছাড়ে। সেটার সব টিকিট ব্ল্যাকে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঘোষণা দেওয়া হয়– আর কোনো নৌযান ছাড়বে না। ঘাটে তখনও দেড় হাজারের মতো যাত্রী ছিলেন, যাদের অনেকে ভোর ৪টা থেকে অপেক্ষা করছিলেন। এমন ঘোষণায় বিক্ষুব্ধ হয়ে যাত্রীরা হামলা করেন। এর পর আশ্বাস দেওয়া হয়, শিপ আসবে। তখন যাত্রীরা শান্ত হন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ও কোস্টগার্ড আসে। স্থানীয় ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীও আসে। তখন ঘাটের লোকজনসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী পাঁচ থেকে ছয়জন যাত্রীকে ধরে নিয়ে গিয়ে কাউন্টারের দরজা বন্ধ করে মারধর করে। পুলিশ-কোস্টগার্ডের সামনেই তাদের মারধর করা হয়। কিন্তু পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্টিমার না ছাড়ার ফলে বিক্ষুব্ধ যাত্রীদের সঙ্গে কাউন্টারে থাকা কর্মচারীদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরবর্তী সময়ে কাউন্টারের লোকজনের প্ররোচনায় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা সাধারণ যাত্রীদের ওপর চড়াও হয় এবং কাউন্টার ভাঙচুর করে। ওই ঘটনায় সাধারণ ৯ যাত্রীকে সন্ত্রাসীরা মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানায় মিথ্যা মামলা করেন বিআইডব্লিউটিসির একজন পরিচালক। ঈদের দিন ২৯ জুন, যখন তাদের মা-বাবা, পরিবারের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের কথা, তারা তখন থানা থেকে কোর্ট হাজতে। শেষ পর্যন্ত সাপ্তাহিক হাজিরার শর্তে তাদের জামিন মেলে। গত ৯ জুন অভিযুক্তদের সাপ্তাহিক হাজিরার তারিখ ছিল। ওই দিন সাপ্তাহিক হাজিরা প্রত্যাহার করে শুনানির দিন ধার্য করে সেদিন হাজিরা প্রদানের জন্য দরখাস্ত দাখিল করা হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই মামলার ঘা সহজে শুকাবে না।

ফেরার সময় একই জট ঈদের আগে কুমিরা ঘাটে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, ঈদের পর সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া ঘাটে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঈদফেরত হাজার হাজার যাত্রী আটকে পড়ে। আবহাওয়ার কারণে নৌ হুঁশিয়ারি থাকায় একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ‘সবেধন নীলমণি’ স্টিমার। ওদিকে ‘দিনে এক জাহাজ এক ট্রিপ’ নীতিতে চলে স্টিমার। শেষ পর্যন্ত এমপি-মন্ত্রীদের হস্তক্ষেপে স্টিমারের চাকা ঘোরে। ঈদের ছুটিতে পরিবারের সান্নিধ্যে যাওয়া লোকজন দেরিতে হলেও কাজে ফিরতে পারে। যাদের কথায় চাকা ঘোরে, চাকা বন্ধ থাকে, তারা কেন অনুরোধ-উপরোধ, টেলিফোন, কাকুতি-মিনতির জন্য অপেক্ষা করে? জমিদারি ভাবটা কাটানো কি একেবারেই অসম্ভব?

হাতিয়ার কী খবর?

গত ৫ জুলাই হাতিয়া থেকে যে লঞ্চ ঈদফেরত যাত্রীদের নিয়ে ঢাকায় আসার কথা ছিল, সেটি আসতে পারেনি। প্রায় দেড়শ যাত্রী নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে তলা ফেটে যায়। কোস্টগার্ড নাগালের মধ্যে থাকায় তাদের সহায়তায় যাত্রীদের নিরাপদে লঞ্চ থেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। এমন পরিস্থিতি মাঝ দরিয়ায় রাতের আঁধারে বা চাঁদপুরের কাছে মেঘনায় ঘটলে কী হতো? ভাবলে গা শিউরে ওঠে!

হাতিয়া থেকে দুটি লঞ্চ প্রতিদিন ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। হাতিয়া থেকে দুপুর ১২টায় ছেড়ে পরদিন সকালে ঢাকা পৌঁছে। দীর্ঘ ১৬-১৭ ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে ঢাকায় যাওয়া এই রুটটি সুস্থ-অসুস্থ সবার জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব লঞ্চে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেই। সাধারণত চিকিৎসাধীন মানুষের জন্য এই রুটটি ব্যবহার না করাই ভালো। নোয়াখালী হয়ে চলাচল তাদের জন্য মন্দের ভালো। নদী উত্তাল থাকলে নলচিরা-চেয়ারম্যানঘাট রুটও ব্যবহার করা যায় না। বাধ্য হয়ে রোগীদের তমরদ্দি ঘাট থেকে ঢাকার লঞ্চে উঠতে হয়। ঢাকা-হাতিয়া রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোতে জীবন রক্ষা সরঞ্জামের মধ্যে লাইফ বয়া, অচল অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র এবং কিছু প্যারাসিটামল, বমিরোধক ট্যাবলেট ও একটি ফার্স্ট এইড বক্স ছাড়া কিছুই নেই। হাতিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর লঞ্চে থাকা কোনো রোগী সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে তীরে নামিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। চাঁদপুর পার হয়ে গেলে তাও সম্ভব হয় না। কারণ, ওই পথে গভীর রাতে ঘাট দেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।

নোয়াখালী হয়ে সি ট্রাকযোগে এক সময় হাতিয়া যাওয়ার সহজ ব্যবস্থা ছিল। একই পথে ফেরি চলতে পারে। সন্দ্বীপেও ফেরি সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা সরকারের আছে; তবে কাজ এগোচ্ছে শামুকের গতিতে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে যে ফেরিগুলো কাজে লাগছে না, সেগুলোর কয়েকটি দিয়ে পারাপার শুরু করা যেতে পারে। অবশ্য তার আগে ফেরি ল্যান্ডিংয়ের জন্য নদীর দুই পাড়ের ঘাটে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তাতেই এ দুই মফস্বল অঞ্চল অনেকটা সদর হয়ে উঠবে।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক ও গবেষক

[email protected]

আরও পড়ুন

×