নির্বাচন
বিতর্কের অবসান হয় না কেন?
আজিজুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০
আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তার অন্ত নেই। দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই, এমনকি আমেরিকা-ইউরোপীয় অঞ্চলের মোড়লরা এ নিয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ করছেন। আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের শোষণ-বঞ্চনার পেছনে ইউরোপ-আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদীদের ন্যক্কারজনক ভূমিকা তো অজানা নয়। তবুও ওই সাম্রাজ্যবাদী মোড়লরা আমাদের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কী বলেন, সেদিকে আমরা দলমত নির্বিশেষে সবাই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকি। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এ জাতীয় আচরণ আমাদের জন্য চরম অবমাননাকর। আমাদের মধ্যে ন্যূনতম দেশপ্রেম থাকলে ওই সাম্রাজ্যবাদী মোড়লদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম না। সমস্যা নিজেরাই সমাধানের চেষ্টা করতাম। কথা হলো, আমাদের সমস্যা আমরাই সমাধান করতে পারছি না কেন? এই ‘কেন’র উত্তর একাধিক।
প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চার রীতি প্রচলিত নেই। এ চর্চা থাকলে দলের কর্মী-সমর্থকের নীতিনিষ্ঠ ও গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন করা যেত। অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকার কারণে কোনো এক ব্যক্তি একবার দলের সর্বোচ্চ পদে আসীন হলে তিনি আমৃত্যু ওই পদে থাকতে চান এবং রোগটি প্রায় সব দলেই সমুপস্থিত। একই কারণে কোনো দল একবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলে সহজে আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। কথাটি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলসহ আগে যেসব দল বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে, সবার বেলায় প্রযোজ্য। কেউই ধোয়া তুলসী পাতা নয়।
আমরা নিজেদের সমস্যা সমাধানে সক্ষম না হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেমের প্রচণ্ড অভাব। স্থানীয় ক্ষমতাশালীরা নির্বিবাদে নিজ নিজ এলাকার খাল-নদী ভরাট করে, গাছপালা কেটে, পাহাড় কেটে আমাদের পরিবেশের বিশাল ক্ষতি করে চলেছে। কোটিপতি বড় ডাকাতরা বিপুল টাকা বিদেশে পাচার করছে, যা দেশ বিক্রি করে দেওয়ার নামান্তর। অথচ ওইসব দেশবিরোধী চক্রের কারও কোনো শাস্তি হয় না। এদের এ দায়মুক্তি দেখে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রাঘববোয়াল নির্মম মজুতদারি-মুনাফাখোরিতে মেতে উঠেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। আজকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে একেবারে হতদরিদ্ররা তাদের প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করতে পারছে না। অনেকে তাদের খাদ্যতালিকা থেকে অনেক আইটেম বাদ দিতেও বাধ্য হচ্ছে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে এই যে নিদারুণ কষ্ট, তা দেখার সময় আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের নেই। কারণ দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রচণ্ড অভাব। রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকলে সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের ন্যূনতম ভালোবাসা থাকত। তাদের কল্যাণ-অকল্যাণ নিয়ে দায়বদ্ধতা থাকত। কিন্তু আমাদের দেশে এই দায়বদ্ধতার প্রচণ্ড অভাব। বাংলাদেশে আমরা বোধ হয় নিজেদের সামাজিক জীব হিসেবেও ভাবি না। ভাবলে একে অন্যের সঙ্গে আমরা আরও ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করতাম। একে অন্যের শোক-দুঃখ ভাগাভাগি করতাম। সমষ্টিগতভাবে দেশ-সমাজের অধিকতর উন্নয়নে অবদান রাখার চেষ্টা করতাম।
তৃতীয় কারণ হচ্ছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা যে কোনো উপনির্বাচন নিয়ে দীর্ঘকালীন বাগ্বিতণ্ডার অবসানে আমাদের আন্তরিকতার অভাব। এ ছাড়া নির্বাচনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে, বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার দেশগুলোয় অফিসিয়ালি খোঁজখবর নিলে জানা যেত ওইসব দেশের নির্বাচনী আইনকানুন কী রকম; নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনে কী কী উপাদান কাজ করে ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো স্থির করতে পারতেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের মতোই অনেক সমস্যা বিরাজমান। তারপরও ভারতের নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট স্বাধীনভাবে এবং সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা থাকলে এখানেও একটি কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিষয়াবলিতে ঐকমত্যের অভাবের চতুর্থ কারণ, মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভক্তি। ১৯৭৫-এ অত্যন্ত ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এ দেশে শুরু হয় ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে আস্ফালন, যা এখনও চলছে। এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বিরোধিতাকারী জামায়াত-শিবির গোষ্ঠী আজও স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করে চলেছে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর এ দেশে যে রাজনৈতিক বিভাজন শুরু হয়েছে, তা আজও চলছে। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছোট-বড় সব শক্তিকে কার্যকরভাবে ঐক্যবদ্ধ করা গেলে হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করা যেত। এটা করা যেত শুধু ১৯৭২-এর সংবিধান পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধান পুনরুজ্জীবনের পক্ষে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও তা পুনরুজ্জীবিত হয়নি। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগ ১৯৭২-এর সংবিধানের পুনরুজ্জীবন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন চায় কিনা?
এর সদুত্তর পেলেই শুধু দেশের নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের অবসান হওয়া সম্ভব। এ ছাড়া এই মহাবিতর্কের কোনো সহজ সমাধান আছে বলে মনে হয় না।
ড. আজিজুর রহমান: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- নির্বাচন
- আজিজুর রহমান
