শোকের মাস
বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্ত কমিশন যে কারণে জরুরি
হারুন হাবীব
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
সম্প্রতি আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কুশীলবদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিশন গঠন করার কথা বলেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। মনে পড়ে, এ ধরনের ঘোষণা আগেও কয়েকবার দিয়েছিলেন আইনমন্ত্রী। সংসদীয় কমিটিও তদন্ত কমিশন গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কয়েক বছরেও সে কমিশন গঠন করা যায়নি। আবারও যখন ঘোষণা এলো তখন প্রশ্ন করার সংগত কারণ থাকে যে, শোকের মাস আগস্ট এলেই বিষয়টি মনে পড়ে? এ ধরনের বিষয়ে গতানুগতিক ঘোষণা না দেওয়াই ভালো।
দেশের নাগরিক সমাজ, মুক্তিযোদ্ধা ও গণসংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য কুশীলবদের শনাক্ত করতে এমন একটি তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এই দাবির পেছনে যেমন সংগত আবেগ আছে, তেমনই রয়েছে জরুরি কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়বদ্ধতা। কারণ ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল না; ছিল সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশকে আঁতুড়ঘরে গলা টিপে মারার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত আঘাত। মোটকথা, ১৫ আগস্ট ঘটানো হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে বিনাশ করার লক্ষ্যে। সে কারণে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন হলেও এ ঘটনার নেপথ্যের ষড়যন্ত্র উন্মোচনের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র ইতোমধ্যে ৫২ বছর অতিক্রম করেছে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সংগঠকদের সবাই মৃত্যুবরণ করেছেন বা নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের হাতেই। একে একে বিদায় নিচ্ছেন সেদিনের সেইসব বীর বাঙালি, যারা অতি সামান্য প্রশিক্ষণেই ব্যাপক প্রশিক্ষিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নেমেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বা রণাঙ্গন অধিনায়কগণ, যারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাও প্রায় সবাই বিদায় নিয়েছেন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বা জগতের স্বাভাবিক নিয়মে। আজও বেঁচে আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান দিয়ে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম বলেছেন, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি এক দীর্ঘ, সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের এই সাহসী সমর অধিনায়ক স্মৃতিচারণ করে আরও জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতীয় গোয়েন্দাসূত্র মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দ এবং তিনিসহ কয়েকজন সেক্টর কমান্ডারকে একটি ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক সদস্যদের একটি অংশ গোপনে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কনফেডারেশন’ করে পাকিস্তানি ভাবধারায় একটি সরকার গঠনের ষড়যন্ত্র করেছিল তখনই। মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে বিপথে পরিচালিত করা। সে ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল মুজিবনগর সরকারের অন্যতম মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। সেই মোশতাকই আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পর ক্ষমতা দখল করেছিল!
একাত্তরে ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। কারণ, তখন একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন সচেতন ও সুসংহত, অন্যদিকে সতর্ক অবস্থানে ছিল মিত্রশক্তি ভারত। অতএব, মুক্তিযুদ্ধ পথভ্রষ্ট হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর সেই সতর্ক অবস্থানে ভাটা পড়েছিল। সেই সুযোগে ১৯৭১-এর ব্যর্থ ষড়যন্ত্র ক্রমান্বয়ে সচল হয়ে ওঠে এবং ১৯৭৫ সালে এসে চূড়ান্ত আঘাত হানে।
ইতিহাস যতই গৌরবময় বা কলঙ্কময় হোক, তা নতুন করে লেখা যায় না। অতএব, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে ক্ষতি হয়েছে, তার পূরণ সম্ভব নয়। ইতিহাসের সত্য উদ্ঘাটন ও নির্মোহ উপলব্ধি জাতিকে উপকৃত করে। সে কারণেই জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কুশীলবদের খুঁজে বের করা জরুরি জাতীয় কর্তব্য।
বলা বাহুল্য, কাজটি সম্পর্কে যত সহজে বলা যায়, করা ততটা সহজ নয়। এটি জরুরি জাতীয় কাজ নিঃসন্দেহে; কিন্তু জিঘাংসা বা বিদ্বেষপ্রসূত কাজ নয়। ইতিহাসের সত্য উন্মোচনের জরুরি কর্তব্য মাত্র। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কণ্টকমুক্ত অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করার জন্যই অতীতের ক্ষতগুলো পরীক্ষা করে দেখা জরুরি। এই কাজে প্রয়োজন বিস্তারিত গবেষণা ও কঠোর সত্যনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। তা সম্ভব হলেই কেবল একদিকে যেমন সদ্য স্বাধীন দেশের মূল চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নাগরিকের জন্য জাতীয় ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য উন্মোচিত হবে।
ইতিহাসের অমোঘ শক্তি ঘাতকরা বুঝতে অক্ষম ছিল। সে শক্তির জোরেই জাতীয় ইতিহাসের লুণ্ঠিত সত্যগুলো ফিরে এসেছে। এককালে যা অভাবিত ছিল, তারই বিজয় ঘটেছে। তিন দশক সময় লাগলেও আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। সেই হত্যাকাণ্ডে সশরীরে অংশগ্রহণকারীদের কৃতকর্মের বিচার হয়েছে। কেউ কেউ দণ্ডও ভোগ করেছে; বাকিরা নানা দেশে পলাতক। বর্তমান সরকার বলছে, পলাতকদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে; যদিও আজ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে, আগস্ট হত্যাকাণ্ড কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল? যারা মারণাস্ত্র হাতে সেদিনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল, তাদের পেছনে কেউ না কেউ ছিল, দেশি ও বিদেশি। তারা শেখ মুজিবকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল। সদ্য-স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক যাত্রাপথ কণ্টকাকীর্ণ করতে চেয়েছিল। অতএব, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কুশীলবদের চিহ্নিত করার বিকল্প নেই।
হারুন হাবীব: মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক [email protected]
- বিষয় :
- শোকের মাস
- হারুন হাবীব
