ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চন্দ্রাভিযান

চাঁদের অন্ধকার দিক

চাঁদের অন্ধকার দিক
×

তাভলিন সিং

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৩ | ০৬:১০

যে সপ্তাহে ভারত চাঁদে পৌঁছেছে, সেই সপ্তাহে এই বিজয় উদযাপনের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে কোনো কলাম লেখা সম্ভব নয়। সুতরাং, আমি সেই বিজ্ঞানীদের অভিবাদন দিয়ে এ কলাম শুরু করছি, যারা এ চন্দ্রাভিযান সফল করেছেন এবং এটি এমন একটি ব্যয়ে তা করেছেন, যা দেখে বিশ্ববাসীর মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

গত বুধবার অনেকের মতো আমিও প্রায় পুরো দিনটি স্নায়বিক উত্তেজনা এবং উদ্বেগের মধ্যে কাটিয়েছি। চাঁদের অন্ধকার দিকে পৌঁছানোর আমাদের আগের ব্যর্থ প্রচেষ্টার স্মৃতি আমায় তাড়া করছিল; এবং শেষ মুহূর্তে কোনো ত্রুটি ঘটে কিনা– এ চিন্তায় আমি টিভি চালু রেখে অনেক সময় নষ্ট করেছি। আমি জানতাম, বিক্রম ল্যান্ডারটি সন্ধ্যা ৬টা বেজে ৪ মিনিটে চাঁদের পিঠে নামবে; কিন্তু তার যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত অনুসরণ করতে গিয়ে আমাকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করতে হয়েছে।

যখন এটি চাঁদের পিঠে স্বাচ্ছন্দ্য এবং গরিমার সঙ্গে নামল, তখন গর্ব এবং দেশপ্রেমে অভিভূত হয়ে গেলাম। প্রধানমন্ত্রী সেই মুহূর্তে আমার টিভির পর্দায় উপস্থিত হলেন। যদিও কিছু লোক মনে করেন, তিনি দৃশ্যপট দখলের চেষ্টা করেছেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে এটিকে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনসূচক তৎপরতা হিসেবেই দেখেছি। কৃতিত্বের একটি অংশ তাঁরও প্রাপ্য। কারণ, ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর প্রতি তাঁর দ্বিধাহীন আস্থার ফল হিসেবেই এটি সম্ভব হয়েছে।

তবে এ কথাগুলোর সঙ্গে আমি এটাও যোগ করতে চাই, এটি এমন একটি এলাকা, যেখানে রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করেন না এবং এখানেই আমরা ভারতের প্রকৃত অনন্যতা দেখতে পাই। এটি বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য এবং ব্যবসার ক্ষেত্রেও সত্য। এটি আমাদের দুর্ভাগ্য– দশকের পর দশক ধরে চলা সমাজতন্ত্র আমাদের উঁচু কিংবা নিচু স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল যে, তাদের সর্বত্র নাক গলানোর অধিকার আছে।

দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই চর্চা আরও বেড়েছে। আমাদের কী খাওয়া-দাওয়া করা উচিত, কোন সিনেমা দেখা উচিত এবং কার সঙ্গে প্রেম করা উচিত বা বিয়ে– তা মোদির মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা আমাদের বলে দিচ্ছেন। যদি সম্ভব হতো, তাহলে তারা ইসরোর বিজ্ঞানীদেরও বলে দিতেন, কীভাবে চাঁদে অভিযানের পরিকল্পনা করা উচিত।

আমরা দেখলাম, আমাদের মহাকাশযান চাঁদে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি এবং কংগ্রেস পার্টির লোকজন এর কৃতিত্ব নিজ দলের নেতাদের দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেস সমর্থকরা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, জওহরলাল নেহরু এবং ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগ না থাকলে আজ ভারতের কোনো মহাকাশ কর্মসূচি থাকত না। এটি বিজেপির রাজনীতিবিদ এবং সমর্থকদের এমন দাবি করতে প্ররোচিত করে যে, মোদির ‘অনুপ্রেরণাদায়ক নেতৃত্ব’ ছাড়া আমরা চাঁদে পৌঁছতে পারতাম না। আমি প্রায়ই ভাবি, তারা হয়তো জানে না– তারা কতটা বোকা এবং বালকসুলভ কথা বলছে।

সত্য হলো, রাজনীতিবিদরা তাদের এখতিয়ারবহির্ভূত যে কাজেই হস্তক্ষেপ করেছেন, সেখানেই ভারতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের মহান ‘সমাজতান্ত্রিক’ নেতারা যখন মনে করেছিলেন, লাইসেন্স রাজের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তখন তার ফলে অর্থনীতির বিকাশ রুদ্ধ হয়েছে। তারা মধ্যবিত্তের সব সম্ভাবনাও গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। সেই সময়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমি এটা বলতে পারি, পরিস্থিতি তখন এতটাই খারাপ ছিল, ভারতের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক নাগরিক চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করত। আমরা যদি আজ আগামী দুই দশকের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখি, তা সম্ভব হতে পারে অর্থনীতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে। যদিও আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, অর্থনীতির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এখনও যথেষ্ট আলগা হয়নি। এ বিষয়ে একেবারে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে মোদি সরকারের সেই পদক্ষেপের কথা বলা যায়, যার মাধ্যমে সাধারণ ভারতীয়দের জন্য কম্পিউটার আমদানি কঠিন করা হয়েছে। এটি একটি একেবারেই মূর্খ ধারণা এবং তা নব্বই দশকের সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, যখন ল্যাপটপ নিয়ে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশে ফেরার কারণে শিক্ষার্থীদের ভারতীয় বিমানবন্দরে আটক করা হতো। আমাদের সমৃদ্ধ সফটওয়্যার শিল্পের লোকজনে সঙ্গে কথা বলুন; তারা আপনাকে বলবে, কীভাবে শুধু একটি কম্পিউটার আমদানি করতে এক বছরের মতো সময় লেগে যায়।

সেলফোন ছিল ওই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের আরেকটি লক্ষ্যবস্তু। শুরু থেকেই সরকারি কর্মকর্তাদের চেষ্টা ছিল কীভাবে ভারতীয়দের সেলফোন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার যায়; এ জন্য দামের দিক থেকে এটিকে মহার্ঘ করে তোলা হয়েছিল। তবে তারা পরাজিত হয় যখন প্রত্যেক ভারতীয় একটি সেলফোন থাকার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। গৃহহীন, ভিক্ষুক, পথশিশুদের হয়তো পর্যাপ্ত খাবার বা মাথার ওপর ছাদ নেই, কিন্তু তাদের সবার কাছেই আজ সেলফোন আছে। এ কারণেই আজ ‘জন ধন’ প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের আর্থিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব মনে হচ্ছে।

আজ যখন চন্দ্রযান-৩ এর বিস্ময়কর সাফল্যে আমরা আনন্দিত এবং মহাকাশে আরও নতুন সাফল্যের জন্য উন্মুখ, তখন আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ– তারা যত বেশি ভারতীয়দের পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছানোর সুযোগ দেবেন, আমরা তত বেশি সাফল্য দেখতে পাব। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিটি বিদেশ ভ্রমণে সেখানে অবস্থানকারী ভারতীয়দের সঙ্গে দেখা করতে পছন্দ করেন। কিন্তু তিনি কি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন, কেন ওইসব মানুষ স্বদেশ ছেড়ে চলে গেল বা কেন বেশির ভাগ ভারতীয় অন্য দেশে গিয়ে এত ভালো করে?

আজ বড় বড় মার্কিন কোম্পানি ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে; মার্কিন হাসপাতালগুলোর সেরা ডাক্তার ভারতীয়; সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সেরা শিক্ষাবিদদের মধ্যে আপনি ভারতীয়দের খুঁজে পাবেন। এই তালিকাটি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা সবাই দেশ ছেড়েছে, কারণ আমাদের রাজনীতিবিদ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সৃষ্ট অস্থির পরিবেশে তাদের পক্ষে ওপরে ওঠা সম্ভব ছিল না। কখনও কখনও এটিকে সরকারের মৃত হাত বলা হয়। তবে সৌভাগ্য, কেউ কেউ আমাদের চাঁদে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইসরোতে থেকে গিয়েছিলেন।

তাভলিন সিং: ভারতীয় কলামিস্ট; দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর করেছেন সাইফুর রহমান তপন

আরও পড়ুন

×