ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিলের মধ্যে পুকুর খনন

পশু মারিয়া পাদুকা দান

পশু মারিয়া পাদুকা দান
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৫০ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৩৬

শনিবার সমকালে প্রকাশিত ‘শহরে ভরাট, গ্রামে পুকুর খনন’ শিরোনাম দেখিয়া অন্তত পল্লি অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ লইয়া পাঠকমহলে আশাবাদ জাগিলেও জাগিতে পারে। কিন্তু প্রতিবেদনটি পড়িলে সচেতন নাগরিকের বিষাদও অস্বাভাবিক নহে। তথায় বলা হইয়াছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে গত ১১ বৎসরে একদিকে রাজশাহী শহরে আট শতাধিক পুকুর ভরাট হইয়া গিয়াছে, অন্যদিকে মৎস্য চাষের নামে কৃষি ও প্রাকৃতিক মৎস্যের অভয়াশ্রম ধ্বংস করিয়া বিভিন্ন উপজেলায় বিলসমূহে একের পর এক পুকুর খনন করা হইয়াছে।

রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলিয়াছেন, জেলায় ৬৭টি বিল আছে, যাহার ৯০ শতাংশই পুকুর খনন হইবার কারণে সম্পূর্ণ আবদ্ধ জলাভূমিতে পরিণত হইয়াছে। যেই ১০ শতাংশ বিল উন্মুক্ত বলিয়া মনে হইতেছে, সেইগুলিতেও সমাজবদ্ধ মৎস্য চাষ চলিতেছে। অর্থাৎ জেলায় সম্পূর্ণ মুক্ত জলাশয় বলিয়া কিছুই আর অবশিষ্ট নাই। অতএব রাজশাহী শহরে তো বটেই, পল্লি অঞ্চলেও প্রাণ-প্রকৃতিবিনাশী আয়োজন থামিয়া নাই। ইহাকে বাংলা প্রবাদের ‘পশু মারিয়া পাদুকা দান’-এর সহিত তুলনা করিলে ভুল হইবে না। কারণ, সরকারি হিসাবে গত এক দশকে রাজশাহীতে ১১ সহস্র পুকুর খননের ফলে চাষযোগ্য মৎস্যের উৎপাদন দাঁড়াইয়াছে কয়েক গুণ। জমির মালিকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হইতেছেন। পূর্বে এক বিঘা জমি ইজারা দিয়া ১০ হইতে ১৫ সহস্র টাকা পাইলেও এখন তাহারা পাইতেছেন ৮০ সহস্র হইতে এক লক্ষ টাকা। ফলস্বরূপ এক প্রকার আর্থিক সচ্ছলতার মুখও হয়তো তাহারা দেখিতে পাইতেছেন।

মুশকিল হইতেছে, সাময়িক লাভ হইলেও এইভাবে বিলগুলি বদ্ধ পুকুরে পরিণত হইবার দীর্ঘমেয়াদি কুফল শুধু তাহাদেরই ভোগ করিতে হইবে না, সমগ্র এলাকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও দুর্ভোগ ডাকিয়া আনিবে। লক্ষণীয়, কয়েক বৎসর পূর্বেও বিলগুলিতে দেশীয় প্রজাতির বিবিভন্ন মৎস্য পাওয়া যাইত, যাহা এখন বিরল। উপরন্তু শীতকালের শেষার্ধে পানি নামিয়া গেলে সেই জমিতে রোপণযোগ্য বোরো ধান, পেঁয়াজ, আলুসহ নানা ফসল এখন উঠিয়া গিয়াছে বলিলেই চলে। ইহাতে বহু প্রকার পাখি ও জলজ প্রাণীও হুমকির মুখে পড়িয়াছে। ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের জন্য জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় এই ক্ষেত্রেও সংকট ঘনায়মান। একই কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হইতেছে। স্বল্প বৃষ্টিতেই ফসলের জমি ডুবিয়া যাইতেছে। শুধু কি তাহাই? জমির মালিক তো কিছু বাড়তি অর্থ পাইয়াই সন্তুষ্ট। মৎস্যচাষিদের পক্ষ হইতে জমির ইজারার ব্যবস্থা করিয়া মধ্যস্বত্বভোগী চক্র ইটভাটায় মাটি বিক্রয় করিয়া কোটি টাকা হাতাইয়া লয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য উর্বরা শক্তি হারাইতেছে সংশ্লিষ্ট জমি, যেইখানে ফসল উৎপাদন কঠিনতর হইয়া দাঁড়ায়।

আমরা জানি, জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুসারে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুরও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে ভরাট করা নিষিদ্ধ। অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সমকালকে বলিয়াছেন, পুকুর খনন করিয়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা অবৈধ। কিন্তু বাস্তবতা হইল, দেশের অন্য জেলার ন্যায় রাজশাহীতেও গত এক দশকে সরকারি পুকুরও ভরাট হইয়াছে। ইহার মধ্যে সরকারি প্রয়োজনে আটটি এবং ৯টি পুকুর অবৈধভাবে ভরাট হইয়াছে। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনায় ১৬৭টি পুকুরকে সংরক্ষিতরূপে গেজেটভুক্ত করা হইলেও ঐগুলি অধিগ্রহণ করা হয় নাই। ফলে ভরাট হইতেছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন দেখিয়াও দেখিতেছে না। এমনকি জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে সরকার প্রতিবৎসর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হইতে বঞ্চিত হইবার পরও উহাদের সক্রিয়তা দৃশ্যমান নহে।

প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিল ধ্বংসকারী প্রায় সকলেরই রাজনৈতিক পরিচয় রহিয়াছে। উহাই সম্ভবত বিল রক্ষায় প্রশাসনের তৎপর না হইবার অন্যতম কারণ। প্রশ্ন হইতেছে, নির্দলীয় সরকারের আমলেও কি প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যাধি কাটিবে না?

আরও পড়ুন

×