বাজারে আগুন
ভোক্তার ত্রিশঙ্কু দশা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৪৯ | আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ | ১১:৫০
নিত্যপণ্যের বর্ধিত মূল্যের চাপে সাধারণ মানুষের এখন ত্রিশঙ্কু দশা চলিতেছে, যাহা বহুবিধ উদ্বেগের কারণ হইতে পারে বলিয়া আমরা মনে করি। গত সোম ও মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শনসূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সমকাল জানাইয়াছে, চাউল-ডাউল, ময়দা, ভোজ্যতৈল, চিনি, ডিমসহ অধিকাংশ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে।
বোরো ধান উঠিতে শুরু করিয়াছে। কৃষক উৎপাদন ব্যয়ের নিম্নে ধান বিক্রয় করিতে বাধ্য হইতেছে; তথাপি প্রকার ও মানভেদে চাউলের মূল্য এক সপ্তাহে তিন হইতে পাঁচ টাকা বৃদ্ধি পাইয়াছে। খোলা ময়দার মূল্য কেজিতে পাঁচ টাকা বৃদ্ধি পাইয়া এখন ৬০-৬২ টাকা। ডিমের মূল্য প্রতি ডজনে বৃদ্ধি পাইয়াছে ২০ টাকা। অধিকাংশ সবজির মূল্য ৬০ হইতে ৮০ টাকার ঘরে।
প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ হইতে ১৯০ টাকা, যাহা গত রমজানে ছিল ১৫০ হইতে ১৬০ টাকা। সোনালি মুরগির দরও চড়া, যাহার কেজি ৩৬০-৩৮০ টাকা। তিন মাস পূর্বেও উহা ছিল ২৬০ টাকা। বুধবার মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সরকার ঘোষণার পূর্বেই ভোজ্যতৈল লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি পাইয়াছে। এদিকে মার্চে যে এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ছিল এক সহস্র ৩৪১ টাকা; মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে এলপিজি ব্যবহারকারী একটি পরিবারের রান্নার ব্যয় বৃদ্ধি পাইয়াছে ৬০০ টাকা।
অন্যদিকে, এই সকল নিত্যপণ্যের মূল্যের উল্লম্ফন এমন সময়ে ঘটিয়াছে যখন গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিস’ এক প্রতিবেদনে জানাইয়াছে, বাংলাদেশে গত বৎসর দেড় কোটির অধিক মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিয়াছে। উপরন্তু বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশসহ মাত্র ১০টি দেশে বাস করেন।
ক্ষুধার্ত মানুষ দিশাহারা হইলে কী ধরনের সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হইতে পারে, তাহার নজির বিভিন্ন দেশে বিস্তর। এই কারণেই বিষয়টির পরিণাম সম্পর্কে প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিশ্লেষকদের হুঁশিয়ারি সরকারের গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করা আবশ্যক বলিয়া আমরা মনে করি।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করিয়াছে এবং এই অগ্নিতে ঘৃতের সঞ্চার করিয়াছে দেশে সকল প্রকার জ্বালানি তৈলের বর্ধিত মূল্য। সম্প্রতি বিশেষত ডিজেলের মূল্য লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির কারণে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১১ পয়সা বৃদ্ধি পাইলেও পণ্যবাহী পরিবহনে এই বৃদ্ধি ঘটিয়াছে কয়েক গুণ। পণ্য বিক্রেতাদের অভিযোগ, জ্বালানির সংকট ও মূল্য বৃদ্ধির কারণ দেখাইয়া ট্রাক মালিকরা ভাড়া বাবদ ১৫ সহস্র টাকার পরিবর্তে ১৮-২০ সহস্র টাকা লইতেছেন। উহার সরাসরি প্রভাব পড়িয়াছে সকল পণ্যমূল্যে। তবে নিত্যপণ্য নূতন করিয়া দুর্মূল্য হওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী, ক্ষেত্রবিশেষে সিন্ডিকেটের কারসাজি অনস্বীকার্য। এই ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারি বরাবরের ন্যায় দুর্বল, এমনকি অনুপস্থিত বলিলেও ভুল হইবে না। বলা বাহুল্য, এহেন মূল্য বৃদ্ধির আঘাতে সাধারণ মানুষই অধিক জর্জরিত। উক্ত নজরদারির ঘাটতি সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদিগের চিরাচরিত উপেক্ষার মনোভাবেরই পুনঃপ্রকাশ ঘটাইল।
বাজার নিয়ন্ত্রণে কিছু সময়ের জন্য নিত্যপণ্যের উপর ভ্যাট ও ট্যাক্স হ্রাসের পরামর্শ দিয়াছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আবু ইউসুফ। তিনি বলিয়াছেন, সরবরাহ ব্যবস্থা যেন বিঘ্নিত না হয়, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে।
মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না লইলে সংকট অচিরেই তীব্রতর হইতে পারে– বিশেষজ্ঞদের এহেন আশঙ্কা অমূলক নহে। তাই সরবরাহ বৃদ্ধি, তৎসহিত বাজার তদারকিতে আমূল পরিবর্তন আনয়ন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ওএমএস, টিসিবির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি করিতে হইবে। পণ্যোৎপাদন ও আমদানি ব্যয়ের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া পণ্যমূল্য নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনা যথার্থ রাখিতে কৃষকদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনাও নিশ্চিত করিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
