পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু
তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফরিদপুরে পুলিশ হেফাজতে এক তরুণের মৃত্যু হইয়াছে বলিয়া সোমবার সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেই সংবাদ দিয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জানাইয়াছে, শনিবার ‘গাঁজা’সহ উক্ত তরুণকে গ্রেপ্তার করিয়া মধুখালী থানায় রাখা হয়। গভীর রাতে তাঁহাকে ডিবি হেফাজতে আনা হইলে তিনি অসুস্থ বোধ করেন। তখন তাঁহাকে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে স্বজনদের অভিযোগ, উক্ত তরুণকে নিজ বাড়ি হইতে গ্রেপ্তার করিয়াছে ডিবি পুলিশ, যাহাদের হেফাজতে নির্যাতনের কারণে মৃত্যু হইয়াছে তাঁহার। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এই দেশে নূতন নহে। দশকের পর দশক ধরিয়া এহেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলিতেছে। অতীতেও প্রায় প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট গ্রেপ্তারকারীরা গ্রেপ্তারকৃতের উপর নির্যাতন না চালাইবার দাবি করিয়াছে। সেই হিসাবে আলোচ্য ঘটনায় ফরিদপুর ডিবি পুলিশের দাবিও নূতন নহে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, সরকারের পক্ষ হইতে তদন্তের মাধ্যমে এই সকল ঘটনার সুরাহা করার আশ্বাস থাকিলেও বরাবর তাহা বাগাড়ম্বরে পরিণত হইয়াছে। ক্ষেত্রবিশেষ পুলিশের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকেই দেওয়ার কারণে সম্পূর্ণ তদন্ত কর্মই চূড়ান্ত প্রহসনে পরিণত হইয়াছিল। স্বীকার করিতে হইবে, এই প্রেক্ষাপটেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের এহেন গুরুতর ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে।
প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিশেষত বিরোধী মত দমনে এহেন অপকৌশলের প্রয়োগ সকল সীমা অতিক্রম করিয়াছিল। এই কারণে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের নিকট নাগরিক সমাজের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সকল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আমূল সংস্কার সাধন। প্রত্যাশা করা হইয়াছিল, সংস্কারের ফলস্বরূপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানাবিধ মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ হইতে পারে। বাস্তবে সেই আশায় গুড়ে বালি!
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদন বলিতেছে, গত বৎসর জানুয়ারি হইতে ডিসেম্বর অবধি পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে ২৩ জন প্রাণ হারাইয়াছেন। এমনকি বর্তমান নির্বাচিত সরকারের গত তিন মাসে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর হেফাজতে ৫ জন প্রাণ হারাইয়াছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সরকারের ১০০ দিন পূর্তির প্রতিবেদনে বলিয়াছে, উক্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে আহত হইয়াছেন ৫ জন; কারা হেফাজতে প্রাণ হারাইয়াছেন ২১-২৮ জন। আলোচ্য ঘটনা উহারই ধারাবাহিকতা মাত্র।
আমরা জানি, এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হইলেও থানা, পুলিশ কিংবা কারা হেফাজত যেই কোনো নাগরিকের জন্য নিরাপদ স্থল। অন্তত আইনের শাসনে বিশ্বাসী একটা রাষ্ট্রে উহাই মান্যতা পাইবার কথা। সম্ভবত এই কারণেই মানবাধিকারকর্মীদের অব্যাহত চাপের মুখে ২০২৩ সালে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ প্রণীত হইয়াছিল। এই আইন অনুসারে, পুলিশ হেফাজতে আটককৃতের উপর যেই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দণ্ডযোগ্য অপরাধ। ইহাও উল্লেখ্য, এই সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি হইল সকল প্রকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, তৎসহিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে কোনো ঘটনায় শূন্য-সহিষ্ণুতা প্রদর্শন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুসহ যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার একটা উল্লেখযোগ্য অংশের শিকার ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মী। সেই হিসাবে কারা বা থানা হেফাজতে প্রাণহানির ন্যায় মানাবধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধ এই সরকারের অন্যতম কর্তব্য হইবার কথা।
আলোচ্য ঘটনায় যেই তদন্ত কমিটি গঠিত হইয়াছে, তৎসহিত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন বলিয়া আমরা মনে করি। বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থেই সরকারকে এই পদক্ষেপ লইতে হইবে। উপরন্তু নিছক তদন্ত নহে, দায়ীদের বিরুদ্ধেও আইন অনুসারে শক্ত পদক্ষেপ লইতে হইবে, যাহাতে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি আমাদের আর দেখিতে না হয়।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
