রাজধানীর হকার ব্যবস্থাপনা
তুঘলকি নহে, টেকসই সমাধান
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ০৯:৫২
রাজধানীর যানজট হ্রাসের কথা বলিয়া পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া হকার উচ্ছেদে ব্যস্ত না হইয়া ভিন্ন সমাধান অন্বেষণের জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসক নিঃসন্দেহে ধন্যবাদার্হ। তবে সেই ভিন্ন পথ যে ইতোমধ্যে তুঘলকি পদক্ষেপতুল্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে, সেই কথাও বলিতে হইবে।
শনিবার প্রকাশিত সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন বলিতেছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর হকার ইস্যুতে শৃঙ্খলা ফিরাইতে দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের পরামর্শে হকার নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়ন করিয়াছে সরকার। সেই নীতিমালা অনুসরণ করিয়া ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন অংশের সড়ক-ফুটপাতে ইতোমধ্যে এক সহস্র ৯০০ হকারকে বসার সুযোগ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। অনুরূপভাবে ঢাকা উত্তর সিটিতেও দুই সহস্র হকারের ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু ঢাকা মহানগরীতে হকার সংখ্যা ছয় লক্ষাধিক। সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিমত, রাজধানীতে হয়তো সর্বোচ্চ এক লক্ষ হকারকে বসার সুযোগ দেওয়া যাইতে পারে। তাই অবশিষ্ট পাঁচ লক্ষ হকারকে বসানো এখন রীতিমতো দুশ্চিন্তার বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিশ্বের অন্যতম অতি জনঘনত্বের এই নগরে যেইখানে মানুষের সহিত যানবাহনও উপচাইয়া পড়ে, এমনকি প্রায়শ দ্বিচক্রযানগুলি ফুটপাতও দখল করিয়া লয়, সেইখানে নিয়ম মানিয়া হকার বসিবে কী প্রকারে?
পরিকল্পনাকে তুঘলকি বলিবার অপর কারণ হইল, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যানবাহন ও পথচারী চলাচলে যথাসম্ভব নির্বিঘ্ন রাখিয়া হকার সমস্যার সমাধান করিতে চাহিলেও কিছু ক্ষেত্রে সড়কের এক পাশ বন্ধ করিতে হইতেছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠিয়াছে, পরিবর্তিত অবস্থায় উক্ত এলাকা দিয়া চলাচলকারী যানবাহন ও পথচারীদের ভোগান্তি কী প্রকারে লাঘব হইবে? যদি ঐ সকল সড়কে যান ও মানুষের চলাচল কম হয়, তাহা হইলে হকারেরা ক্রেতাশূন্য সেই সকল স্থানে বসিতে আগ্রহী হইবেন কেন? বিকল্প হিসাবে কয়েকটি এলাকায় নৈশ মার্কেট বসানোর যেই পরিকল্পনা করিয়াছে দুই সিটি করপোরেশন; হকারদের আগ্রহী করিয়া তুলিতে পারিলে তাহা সমস্যার তীব্রতা কিছুটা হইলেও হ্রাস করিতে পারে। পরিকল্পনা অনুসারে, অফিসপাড়ায় অপরাহ্ণ সাড়ে ৫টা হইতে রাত্রি ১১টা পর্যন্ত হকাররা বসিতে পারিবেন। দুই সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারাধীন আরও কিছু এলাকা এহেন নৈশ মার্কেটের জন্য অন্বেষণ করা হইতেছে বলিয়া জানা গিয়াছে। উহার বাস্তবায়ন কতখানি সম্ভব, দেখিবার বিষয়।
স্মরণে রাখিতে হইবে, রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থান অনেক কম। সকল কিছুই এখানে অপরিকল্পিত ও ঘিঞ্জি। তদুপরি প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, যেই সকল সড়ক-ফুটপাতে রং দিয়া হকার বসার স্থান নির্ধারণ করা হইয়াছে, উহা অনুসরণ করিতেছেন না সংশ্লিষ্ট হকাররা। তাহারা পূর্বের ন্যায় ইচ্ছানুযায়ী ফুটপাত ও সড়কের উপর বসিয়া যাইতেছেন। সরেজমিন পরিদর্শনেও দেখা গিয়াছে, গুলিস্তান এলাকার সমগ্র ফুটপাত হকারের দখলে। সড়কের মধ্যেও দোকান বসানো হইয়াছে। কোনো কোনো সড়কে চলাচলের অবস্থাই নাই। অন্য এলাকায় বরাদ্দপ্রাপ্ত হকার ভিড় করার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট হকারদের বক্তব্য, তাহাদেরকে যেখানে বসিতে বলা হইয়াছে সেখানে বিক্রয় কম হয়।
মোদ্দা কথা, শুধু স্থান নির্ধারণ করিয়া দিয়া সকল হকারকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনয়ন সম্ভব নহে। সমস্যাটির সমাধানে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ইহাও স্মর্তব্য, গ্রামগঞ্জ, এমনকি মফস্বল শহরে কার্যের সুযোগ না থাকায় রাজধানী ও বড় শহরমুখী হকারের অন্তহীন স্রোত চলিতেই থাকিবে। আমরা মনে করি, কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এই ক্ষেত্রে টেকসই সমাধান মিলিতে পারে। তবে সমস্যাটির আশু সমাধানের জন্য নগর পরিকল্পনাবিদসহ সকল অংশীজনের সহিত পরামর্শক্রমে নৈশ, হলিডে মার্কেট স্থাপনসহ কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হইতে পারে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
