জনমিতিক সুবিধা
সময় থাকিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড তথা জনমিতিক সুবিধাকে কার্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকিলেও বিবিধ কারণে উহা হাতছাড়া হইবার যে আশঙ্কা দেখা দিয়াছে, তাহা দুর্ভাগ্যজনক। মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ হইতে জানা যাইতেছে, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, নারীর কম অংশগ্রহণ ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধাকে কার্যে ব্যবহার করিতে পারিতেছে না। ২০৪৫ সাল পর্যন্ত দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বৃদ্ধি পাইবে। এই সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করিতে না পারিলে দেশকে বিবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতে হইবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে যথার্থই উঠিয়া আসিয়াছে, দেশের শিক্ষার নিম্নমান দক্ষতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করিবে। ১০ বৎসর বয়সী শিশুদের অর্ধেক সংখ্যকই যেথায় সহজ লেখা পাঠ করিয়া বুঝিতে পারে না, তথায় ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির কী হইবে, সহজেই অনুমেয়। শিক্ষার এই ঘাটতি ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করিবার জন্য যথেষ্ট।
যাহা সর্বাধিক আশঙ্কার বিষয়, প্রতিবেদনে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধির চিত্রও দেখানো হইয়াছে; যেথায় উন্নত দেশগুলিতে প্রবীণপ্রধান সমাজ গঠিত হইতে সময় লাগিয়াছে ৭২ বৎসর হইতে ১২৬ বৎসর পর্যন্ত; তথায় বাংলাদেশ প্রবীণপ্রধান সমাজে রূপান্তর ঘটিবে মাত্র ২৪ বৎসরে। অথচ এই বার্ধক্যের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নাই বলিলেই চলে। প্রবীণের প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও মানসিক যেই প্রস্তুতি দরকার, তাহার কিছুই নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা নাই। এমনিতেই যেথা চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই মানুষের নিজ পকেট হইতে ব্যয় হয়, তথায় প্রবীণ বয়সে তাহাদের চিকিৎসা ব্যয় কে বহন করিবে?
প্রসঙ্গত, দেশে কর্মরত মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশই যেথা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, সেথায় তাহাদের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরকালীন সুবিধা লইয়া অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা রহিয়াছে। তৎসহিত আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলিতে কর্মসংস্থান তৈয়ারে ধীরগতি দৃশ্যমান। এমনকি উচ্চশিক্ষা থাকিলেও অনেকের আনুষ্ঠানিক চাকরি নিশ্চিত হইতেছে না। বিষয়গুলি উদ্বেগের হইলেও আমাদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে যথাযথ তাগিদ অনুভব করিলে এইগুলি এক প্রকার আশীর্বাদে রূপান্তরিত হইতে পারে।
আমরা মনে করি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পাইবার ক্ষেত্রে প্রস্তুতির জন্য এখনও সময় স্বল্প নহে। কর্মক্ষম মানুষের যেই সংখ্যাকে আমরা বোঝা মনে করিতেছি, তাহাদের জনসম্পদে রূপান্তরের বিকল্প নাই। এই ক্ষেত্রে শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা, নারীর কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষতার ঘাটতিজনিত যেই সকল চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, সেইগুলি মোকাবিলা করিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ লইতে হইবে। তজ্জন্য শ্রমবাজার শক্তিশালীকরণ আবশ্যক। তরুণ প্রজন্মকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করিয়া তুলিতে মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে জোর দিতে হইবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে উন্নত ও আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করিতে হইবে। তৎসহিত কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাও দূর করা প্রয়োজন।
অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রবীণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে চিকিৎসা ব্যয় মানুষের আয়ত্তের মধ্যে আনয়ন এবং স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় মৌলিক পরিবর্তন আনিতে প্রতিবেদনে যে তাগিদ দেওয়া হইয়াছে, তাহা গুরুত্বপূর্ণ।
এতদ্ব্যতীত প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আরও সম্প্রসারণ ও কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, এই সম্ভাবনাকে কার্যে রূপান্তরে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সরকার একটি কমিটি গঠন করিয়া দিতে পারে, যাহারা গবেষণা করিয়া বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম নীতি-কৌশল প্রণয়ন করিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়