পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ
আলোচনাই সমাধানের সর্বোত্তম পথ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ সহস্র টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত কয়েক দিন যাবৎ বিশেষত রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের যেই বিক্ষোভ চলিতেছে, উহা উদ্বেগজনক। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার ঢাকার মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে বিক্ষোভ করিয়াছেন; গাজীপুরের কালিয়াকৈরে টানা চতুর্থ দিনের ন্যায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করিয়া বিক্ষোভ চলিয়াছে। সোমবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডও অনুরূপ অবরোধের মুখে পড়ে। প্রায় প্রতিটা স্থানেই পুলিশের সহিত শ্রমিকদের একাধিকবার সংঘর্ষ হইয়াছে। বিক্ষোভের মধ্যে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটিয়াছে।
এই সহিংস বিক্ষোভের ফলে ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে পাঁচ শতাধিক কারখানা সাময়িক বন্ধ হইয়া গিয়াছে, যাহার ক্ষতি বহুবিধ। একদিকে কয়েক সহস্র শ্রমিকের চাকুরি হারাইবার শঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে, অন্যদিকে বিশেষত রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলি নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ বিষয়ে ঝুঁকির সম্মুখীন। ইহাতে কেবল সংশ্লিষ্ট মালিকগণই লোকসানের শিকার হইবেন না; দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণেও বিঘ্ন ঘটিতে পারে; যাহার অভিঘাত সামগ্রিক অর্থনীতি তথা জনগণকেই বহিতে হইবে। স্মরণে রাখিতে হইবে, পোশাক খাত কেবল ৪০ লক্ষাধিক মানুষেরই কর্মসংস্থান জোগায় না; দেশের ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয়েরও উৎস। তদুপরি এই খাতের উপর নির্ভরশীল অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনায় লইলে কর্মসংস্থান ও জাতীয় আয়ে উহার অবদান বৃহত্তর।
আমরা জানি, সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে পোশাক খাতে মালিক-শ্রমিকসহ সকল অংশীজনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ১২ সহস্র ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি ঘোষণাও কার্যকর হয়। ইতোপূর্বে সাধারণত পাঁচ বৎসর অন্তর এই খাতে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করিয়া মজুরি পুনর্নির্ধারণ করিবার নিয়ম থাকিলেও গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাসকৃত শ্রম আইনে দুই নিম্নতম মজুরি বোর্ডের মধ্যে সময়ের ব্যবধান পাঁচ বৎসরের পরিবর্তে তিন বৎসর ধার্য করা হয়। সেই হিসাবে এই নভেম্বর মাসে নূতন নিম্নতম মজুরি বোর্ড ঘোষণার কথা। আশার বিষয়, পালাক্রমে শ্রমিক নেতা এবং তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ নেতাদের সহিত বৈঠক করিয়া শ্রমমন্ত্রী রবিবারই ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়াছেন; যেইখানে মালিক-শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরই প্রতিনিধি রহিয়াছেন। এই বোর্ড সকল পদে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির পরিমাণ সুপারিশ করিবে।
বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে নূতন মজুরি কাঠামো ঘোষণা ও গেজেট হিসাবে প্রকাশ করিবে সরকার। এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের সড়ক ত্যাগ করিয়া আপন আপন কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তন করিবার কথা। সরকার, তৎসহিত বিভিন্ন শ্রমিক নেতাও ইতোমধ্যে সেই আহ্বান রাখিয়াছেন। কিন্তু দুঃখজনক, উহাতেও বিক্ষোভ বন্ধ হয় নাই। বরং সোমবার নূতন করিয়া বহু কারখানায় কর্তৃপক্ষ অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি ঘোষণা করিতে বাধ্য হইয়াছে। এহেন পরিস্থিতি কাহারও কাম্য হইতে পারে না।
ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, বৈশ্বিক বিবিধ সমস্যার সহিত বিশেষত ব্যাংকিং খাতের অনাচার, তীব্র জ্বালানি ঘাটতিসহ অভ্যন্তরীণ বহুবিধ সংকট যুক্ত হইয়া সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনীতির চাকা আশঙ্কাজনকভাবে শ্লথ হইয়া গিয়াছে। ইহার ফলে পোশাকশিল্পকেও অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে হইতেছে। এমতাবস্থায় দেশের বৃহত্তম শিল্প খাতে অস্থিরতা ও সহিংসতা অর্থনীতিকে অধিকতর বিপর্যয়ের দিকে ঠেলিয়া দিবে। সর্বোপরি, যেইখানে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সর্বোত্তম পন্থা হিসাবে আলোচনার পথ উন্মুক্ত, সেইখানে সহিংস বিক্ষোভ
উপযুক্ত পন্থা হইতে পারে না। আমাদের প্রত্যাশা, শ্রমিকরা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের মাধ্যমে মজুরি বোর্ডে তাহাদের দাবিদাওয়া লইয়া দরকষাকষিতে মনোনিবেশ করিবেন। অন্যপক্ষ বিশেষত মালিকগণও শিল্পের স্বার্থে শ্রমিকদের সন্তুষ্টি বিধানে মনোযোগী হইবেন।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়