আলোচনা সভায় বক্তারা
ধর্মীয় চিন্তা থেকে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না
ছবি- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | ০১:২৭
রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন হতে পারে বলে মত দিয়েছেন বক্তারা। তবে তারা বলেছেন, সংবিধানের মূল জায়গায় হাত দেওয়া যাবে না। সংবিধান সংশোধনের যথাযথ প্রক্রিয়া রয়েছে। সংশোধনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্মীয় চিন্তা থেকে কোনোভাবেই সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য যারা সংবিধান সংশোধন করতে চান, তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। জনগণ এমন সংশোধন মেনে নেবে না।
সংবিধান দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাসান তারিক চৌধুরী।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ড. কামাল হোসেন। অসুস্থ অবস্থায় হুইলচেয়ারে করে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের প্রচার সম্পাদক সানজিদ রহমান শুভ। লিখিত বক্তব্যে কামাল হোসেন বলেন, মানুষের অধিকার রক্ষার কাজ এখনও শেষ হয়নি। দেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সুষ্ঠু নির্বাচন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বর্ণ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো বৈষম্য চলতে দেওয়া যাবে না।
গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান জাতির সংগ্রামের ফসল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শোষণমুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল দেশের মানুষ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। জনগণই রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক। তিনি বলেন, সংবিধানকে সমুন্নত রেখে আমরা সবাই মিলে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।
আলোচনা সভায় সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, ‘সময়ের বিবর্তনে সংবিধান সংশোধন করা অবশ্যই প্রয়োজন। সেটা আমরাও চাই। তবে একটা সঠিক পদ্ধতি আছে। সংবিধান সংশোধনের নামে জাতিকে বিভক্ত করা যাবে না। সম্প্রতি আমাদের কিছু তরুণ বন্ধু বলেছেন, সংবিধান ছুড়ে ফেলতে হবে, পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাদের এ ধরনের কথা অবৈধ। জুলাই সনদ মানতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’ তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল তারা আজ সংবিধান সংস্কার করতে চায়। গণভোটের জন্য তারা লংমার্চ করে।
সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ধর্মীয় চিন্তা থেকে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য যারা সংবিধান সংশোধন করতে চান, সেটা অতীতেও টেকেনি, ভবিষ্যতেও টিকবে না। আর যদি গণভোটের জন্য করতে চান, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য করতে চান, সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য করতে চান– সর্বজনীন হলে হয়তো টিকে থাকবে। তিনি বলেন, কোটি কোটি মানুষকে কর্মহীন রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ধর্মীয় চিন্তা থেকে সংবিধান সংশোধন নয়, বরং সংবিধান সংশোধনে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন, তবে সেটা হতে হবে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে। সংবিধান সংশোধন করতে গিয়ে যেন সুরক্ষামূলক বিধানগুলো বাদ না পড়ে, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি সংবিধান নিয়ে আলোচনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, ৭২ এর সংবিধান নিয়ে অতীতে যে সমালোচনাগুলো এসেছিল, এর অনেক কিছু এখনও অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া হয় নাই। তড়িঘড়ি করে কিছু না করে জনগণের মতামত নিয়ে অবশ্যই সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন। একটি দেশের ৫০ বছর পার হওয়ার পর সমাজের পরিবর্তন আসে, দেশের মধ্যে পরিবর্তন আসে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিবর্তন আসে। এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে সেগুলোর প্রতিফলন অবশ্যই আমরা আমাদের সংবিধানেও দেখতে চাই। সংবিধানে অবশ্যই ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আমাদের মূলনীতিগুলো রক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রত্যেক মানুষের জীবনের অধিকার সঠিকভাবে রক্ষা করতে হবে।
সভায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ একটি পর্যায়ে এসেছে। এখন জাতিকে আর বিভক্ত না করে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘৫৪ বছর ধরে আমরা আন্দোলন সংগ্রাম করছি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য। এক এগারোর সরকার কিছুটা করেছে। সচিবালয় (সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়) এখান থেকে তুলে নিয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলে আমরা যেখানে ছিলাম সেখানেই রয়ে গেছি।’ তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন। সেই লক্ষ্য থেকে সরে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সুব্রত চৌধুরী অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে বিরোধী দল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে দিতে চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে মবতন্ত্র ও মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে, যার প্রভাব এখনো মানুষকে ভোগাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, মৌলবাদী গোষ্ঠী দেশে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই যে কোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে হবে এবং তাদের নির্মূল করতে হবে।