ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

নারীর বিরুদ্ধে অনলাইন সহিংসতা

প্রতিকার ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা জরুরি

প্রতিকার ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা জরুরি
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতার বিস্তার ঘটিলেও ইহা প্রতিকারের ব্যবস্থা হতাশাজনক। বিশেষত শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের ‘অনলাইনে সহিংসতার শিকার ৪৫.৫ শতাংশ নারী’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ইহারই সাক্ষ্য দিতেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক নারী সহিংসতার শিকার হইলেও অধিকাংশই প্রতিকার পান নাই। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ডিজিটালি রাইটের এই যৌথ গবেষণায় আরও উঠিয়া আসিয়াছে, অনলাইন সহিংসতার প্রতিকার না পাইয়া অনেকে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার কমাইয়া দিয়াছেন। কেহ কেহ পড়াশোনা, চাকরি ও বাসস্থানও বদলাইতে বাধ্য হইয়াছেন। গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে, আর্থিক প্রতারণা, যৌন হয়রানি, ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈয়ারির মাধ্যমে নারীকে হয়রানি করা হইতেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআইয়ের কারণে নারীর ভুয়া ছবি ও ভিডিও বানানো আরও সহজ হইয়াছে, যে কারণে হয়রানি বাড়িয়াছে। 

তথ্য-প্রযুক্তির এই সময়ে কাজের সূত্রেই অনলাইন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক মাধ্যম ব্যতিরেকে যেখানে দাপ্তরিক কাজ ও যোগাযোগ, পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ও তথ্যের উৎস হিসাবে তথা সময়ের প্রয়োজনে সবাই অনলাইনের উপর নির্ভরশীল, সেইখানে এই মাধ্যমটিতে নারীর নাজুকতা নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন হইবার জন্য যথেষ্ট। বেদনাদায়ক ব্যাপার হইতেছে, অনেকেই তাহা মুখ বুজিয়া সহ্য করিয়া থাকেন এবং প্রতিকারের জন্য তাহারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানাইতেও নিরাপদবোধ করিতেছেন না। গবেষণাটির তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার শিকার নারীর ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ অপরাধীকে ব্লক করিয়াছেন। ভয়ের কারণে ২১ শতাংশ সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার কমাইয়া দিয়াছেন এবং জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭১ শতাংশের অধিক মনে করিয়া থাকেন, অনলাইন সহিংসতার শিকার হইলে সমাজে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। তদুপরি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ লইতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে উল্টা নারীই আরও ভয়ানক নেতিবাচক প্রচারণার শিকার হন। ইহার অর্থ হইল, অনলাইনে এবং বাস্তবে উভয় ক্ষেত্রেই নারীর নিরাপত্তা লইয়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় একই রকম। এই কারণে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে যখন কোনো নারী তাহার সহকর্মীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হন তখনও তিনি নিজেই চাকরি ছাড়িয়া দিয়া নিপীড়ন হইতে বাঁচিতে চাহেন। প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার ক্ষেত্রে প্রশাসন ও সমাজের যে দুর্বলতা রহিয়াছে, ইহাই তাহার প্রমাণ। 
গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে, বর্তমানে নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির বড় অংশই সংঘটিত হইতেছে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে। ইহা প্রতিরোধে নিজস্ব প্রোফাইলের নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ হয়রানির প্রমাণ হাজির করিয়া প্রয়োজনে ৯৯৯ বা পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে যোগাযোগ করিয়া আইনি সহায়তা লওয়া যাইতে পারে। 

তবে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু আইন বা প্রতিরোধমূলক টুল যথেষ্ট নহে, প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়িয়া তোলা। আমাদের অনুধাবন করিতে হইবে যে ভার্চুয়াল জগতের একটি কমেন্ট বা মেসেজও বাস্তব জীবনে গভীর ক্ষত তৈয়ারি করিতে পারে। নারী যাহাতে ভুক্তভোগী হিসাবে প্রতিকারের সন্ধানে সহজে প্রশাসনের দ্বারস্থ হইতে পারে সেই জন্য অভিযোগ দায়েরের ব্যবস্থাসমূহও নারীবান্ধব হইতে হইবে। এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষত নারী অধিকার বিষয়ে সচেতন করিবার কোনো বিকল্প নাই। অনলাইনে ভুক্তভোগীরা যদ্রূপ সামাজিক মর্যাদাহানির শিকার হইয়াছেন, তদ্রূপ আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন। মানসিক যন্ত্রণার বিষয়টিও জরিপে উঠিয়া আসিয়াছে। সেই জন্য অনলাইনের ঝুঁকির বিষয়গুলিতে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। অনলাইন ব্যবস্থাপনায় তরুণীদের সতর্কতা অবশ্যই জরুরি, পাশাপাশি সামষ্টিক দায়িত্বশীলতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। মনে রাখিতে হইবে তরুণীদের প্রতি যে কোনো হয়রানি নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর আগাইয়া চলা এবং আর্থসামাজিক উন্নতির পথেও অন্তরায়। 
 

আরও পড়ুন

×