ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

হামসহ প্রাণঘাতী তিন রোগের শঙ্কা

টিকা কর্মসূচির দুর্বলতা দূর করুন

টিকা কর্মসূচির দুর্বলতা দূর করুন
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের পর প্রাণঘাতী আরও তিন রোগ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিও হানা দিতে পারে বলিয়া সোমবার বিশেষজ্ঞদের তথ্যের বরাত দিয়া বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে প্রকাশিত আশঙ্কাটি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের দ্রুত বিবেচনায় লওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে এই বিষয়ে বলা হইয়াছে, অক্টোবরের শুরুর দিকে পরিচালিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন কমিটির গবেষণার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রণীত হইয়াছে, যেইখানে উক্ত তিন রোগ সম্পর্কিত তথ্যগুলি উঠিয়া আসিয়াছে। শুধু উহাই নহে; বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, হামের প্রাদুর্ভাব দেশের অবনতিশীল টিকাদান ব্যবস্থার অবস্থা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও সতর্কসংকেত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলিতেছে, গত মার্চ হইতে অদ্যাবধি হামের কারণে দেশে ১২ শতাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটিয়াছে এবং আক্রান্ত হইয়াছে দুই লক্ষ ২০ সহস্রাধিক মানুষ। বর্তমানে সূচিত কর্মসূচিতে অদ্যাবধি দেশের মাত্র ৮২ শতাংশ শিশু পূর্ণাঙ্গ টিকা পাইয়াছে। অথচ ইহার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ হাম মোকাবিলায় হিমশিম খাইতেছে বাংলাদেশ। তাই প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকি হ্রাসে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হইলে বৃহদাকারে পারটুসিস বা হুপিং কাশি, ডিপথেরিয়া, এমনকি টিকা হইতে উদ্ভূত পোলিও ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে কর্মসূচি শুরুর পর বাংলাদেশ পোলিও এবং নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল করিয়াছে। পাশাপাশি রুবেলা ও হেপাটাইটিস-বি নিয়ন্ত্রণে আনিতে সক্ষম হইয়াছিল। তদুপরি ১৯৮৯ সালে ইপিআই তথা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তির পর হামের টিকাও হালে মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করা রোগটিকে প্রায় নির্মূল করিতে সক্ষম হইয়াছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ছিল। তজ্জন্য ইতোপূর্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পুরস্কারও অর্জন করিয়াছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে সহজে ইহা ছড়াইলেও যাহার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নাই। এই রোগের কারণে মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। অন্যদিকে হুপিং কাশি শিশুদের, বিশেষত নবজাতক ও অল্পবয়সী শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। ডিপথেরিয়ায় শ্বাসনালি বন্ধ, তৎসহিত হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। অধিকন্তু পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে পোলিও ভাইরাস ছড়াইয়া পড়িলে পক্ষাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল, পর্যালোচনা প্রতিবেদনে হামসহ আলোচ্য রোগগুলির পুনঃপ্রাদুর্ভাবের কারণও উল্লেখ করা হইয়াছে: টিকাদান কর্মসূচিতে কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ানের ৫৩ শতাংশ পদ, স্বাস্থ্য সহকারীর ৩৪ শতাংশ পদ এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সদরদপ্তরের ৪৫ শতাংশ পদ শূন্য রহিয়াছে। তদুপরি, তদারকি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে শূন্যতার হার ৩২ হইতে ৪৩ শতাংশের মধ্যে। 

প্রতিবেদনে টিকাদান কার্যক্রমের পরিকল্পনাগত দুর্বলতার বিষয়ও তুলিয়া ধরা হইয়াছে। স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রতিবৎসর বিপুলসংখ্যক যোগ্য শিশু টিকাপ্রাপ্তি হইতে বঞ্চিত হয়; বিশেষত শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং দুর্গম অঞ্চলের জনগোষ্ঠী টিকাদান সেবা পাইতে গিয়া বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ে। এমতাবস্থায় সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে ওয়ার্ড পর্যায়ের টিকাদান পরিকল্পনা জরুরি ভিত্তিতে সংশোধনের গুরুত্ব সম্মুখে চলিয়া আসিয়াছে। পরিকল্পনা হালনাগাদ করার পূর্বে এক বা একাধিক টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত এবং তাহাদের টিকার আওতায় আনয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি।

প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিকট জমা দেওয়া হইয়াছে। আশার বিষয়, সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়াছে, যাহার সূচনারূপে দ্রুত টিকাদানকর্মী নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত লইয়াছে সরকার। আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিবেদনের অপরাপর সুপারিশও কালবিলম্ব না করিয়া অগ্রাধিকার তালিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হইবে।
 

আরও পড়ুন

×