নূতন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন
সমীক্ষাবিহীন সিদ্ধান্ত নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যার বিচারে পর্যাপ্ত থাকিবার পরও নূতন করিয়া ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের চেষ্টা কেন চলিতেছে– একটি গুরুতর প্রশ্ন বটে। সোমবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যমান, যাহার অধিকাংশেরই পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নাই। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধেকের অধিক সংখ্যক আসন শূন্য থাকিতেছে এবং শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট, স্থায়ী ক্যাম্পাস ও গবেষণার পরিবেশ লইয়াও রহিয়াছে বিস্তর প্রশ্ন। এহেন পরিস্থিতিতে নূতন করিয়া ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমাকৃত আবেদনে অনুমোদনের চেষ্টা চলিতেছে। কিন্তু একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য যখন শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, তখন শিক্ষার্থী না থাকিলে কিংবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলি প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না পাইলে নূতন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের যৌক্তিকতা কোথায়?
যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের অপরিহার্য শর্ত হইল উহার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে যথাযথভাবে পরিচালিত সমীক্ষার ফলাফল যাচাই করা, যেখানে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার আলোচনাও থাকা জরুরি। উপরন্তু অঞ্চলভেদে উচ্চশিক্ষা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ জনবলের চাহিদা ও সরবরাহও নিরূপণযোগ্য। আলোচ্য ক্ষেত্রে এই সকল শর্ত বিবেচিত হইলে অনুমোদন প্রক্রিয়ার গতি রুদ্ধ হইবার কথা। কারণ শিক্ষার মান ও চাহিদা বিবেচনায় না লইয়া কেবল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা শেষ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় সংকট আরও ঘনীভূত করিতে পারে। নূতন প্রতিষ্ঠানের পশ্চাতে ব্যয়িত সম্পদেরও অপচয় হইতে পারে। সর্বোপরি, এহেন অনুমোদন ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও প্রতিযোগিতার মুখে ফেলিয়া উহাদের সংকট গভীরতর করিতে পারে।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতেছে। তবে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর সকল শর্ত পালন করিতে পারে নাই। উহাদের বিরাট অংশ অদ্যাবধি স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়িয়া তুলিতে অসমর্থ, যদিও শিক্ষার্থীদের উপর ইচ্ছামতো ফি চাপাইবার ক্ষেত্রে উহাদের কোনো খামতি নাই। অভিযোগ রহিয়াছে, ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হইলেও বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত এক প্রকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যদিও সংশ্লিষ্ট আইন তাহা অনুমোদন করে না। এমতাবস্থায় নূতন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অর্থ হইল উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের পথকে আরও প্রশস্ত করা; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ শিক্ষার্থীদের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলা।
আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন কোনো সংখ্যাগত প্রতিযোগিতা নহে; উহা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ। তাই নূতন ১১টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের চেষ্টা করিবার পূর্বে উহাদের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য কল্যাণ-অকল্যাণ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। শিক্ষার্থী সংকটের বাস্তবতা উপেক্ষা করিয়া প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলির মানোন্নয়ন, শিক্ষক সংকট দূরীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও মনে রাখিতে হইবে, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যের জন্য প্রতিষ্ঠা করা যাইবে না। সমাজের কল্যাণই মুখ্যত বিবেচনা করিতে হইবে।
অভিজ্ঞতা হইতে বলা যায়, এহেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সহিত যুক্ত ব্যক্তিবর্গ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট। তাই নূতন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের জন্য স্বচ্ছ ও অভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করিতে হইবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও মঞ্জুরি কমিশনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়া অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রভাব কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে শিক্ষার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়