ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

লালন আখড়ায় টাইম বোমা

জড়িতদের আইনের আওতায় আনুন

জড়িতদের আইনের আওতায় আনুন
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মরমি সাধক লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ি হইতে একটি টাইম বোমা ও দুই বোতল পেট্রোল উদ্ধার হইবার ঘটনাটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রবিবার মধ্যরাতে আখড়াবাড়ির অভ্যন্তরে একটি ব্যাগে বোমা থাকিবার খবর পায় স্থানীয় পুলিশ। সোমবার ঢাকা হইতে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল গিয়া তাহা নিষ্ক্রিয় করে। শনিবার ছিল লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। এই উপলক্ষে উক্ত আখড়াবাড়িতে প্রতিবারের ন্যায় তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন ছিল, যেখানে কয়েক সহস্র বাউল, সাধক ও লালনভক্ত সমবেত হইয়াছিলেন। এই আশঙ্কা অমূলক নহে যে, বোমাটি বিস্ফোরিত হইলে সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি বহু প্রাণহানি ঘটিত। এই প্রসঙ্গে ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে এবং ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকার রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনা দুইটি স্মরণ করা যাইতে পারে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ এই দুই বিয়োগান্তক ঘটনায় অন্তত ২০ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও বহু মানুষ। লালনের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা রাখিবার ঘটনাটিকে কেহ উদীচী ও রমনা বোমা হামলার ধারাবাহিকতা মনে করিলে তাহাকে দোষ দেওয়া যাইবে না।

বিশেষত গত প্রায় আড়াই বৎসর যাবৎ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার এবং সাংস্কৃতিক স্থাপনা ও অনুষ্ঠানে যে হামলা, ভাঙচুর–এমনকি অগ্নিসংযোগের ন্যায় গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হইয়া চলিয়াছে, আলোচ্য ঘটনাটি উহা হইতেও বিচ্ছিন্ন কিছু নহে। উক্ত সময়ে একটি চিহ্নিত মহল বিভিন্ন বাউলের আখড়াবাড়ি ও সংগীতের আসরে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড চলে এমন অভিযোগ তুলিয়া হামলা চালাইয়াছে, বহু বাউলশিল্পী ও ভক্তকে মারধর করিয়া ভুয়া মামলা দিয়া কারাগারেও নিক্ষেপ করিয়াছে, যদিও অধিকাংশ বাউলশিল্পী ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মর্মবাণীই তাহাদের ন্যায় মানুষের সম্মুখে তুলিয়া ধরেন। এমনকি এই দেশে ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখিলেও, বহু ইসলামী সাধকের সমাধি ঘিরিয়া গড়িয়া উঠা মাজারও ওই কথিত অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ হইতে রেহাই পায় নাই। এই বিষয়ে কোনো দ্বিমতের কোনো অবকাশ নাই যে, এই দেশে যাহারাই সহস্রাধিক বৎসর ধরিয়া গড়িয়া উঠা সমন্বয়বাদী জীবনধারা ও সংস্কৃতির চর্চা বা তাহার মর্মবস্তুকে প্রচার করিতে চাহিতেছে তাহারাই উক্ত চিহ্নিত উগ্রবাদী মহলের রোষানলে পড়িতেছে। এই কারণে এমনকি আধুনিক শিল্পকলা ও সংস্কৃতি চর্চাও উহাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হইয়াছে। একটু অনুসন্ধান করিলেই জানা যাইবে, লালন এবং এই ধারার সাধকেরা মানুষের মধ্যে যে মানবতাবাদী দর্শন ও মিলনের সুর ছড়াইয়া দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন, তাহা হইতে বিভিন্ন পীর-ফকিরের দরবার ও খানকার কর্মকাণ্ড আদৌ ভিন্ন নহে। উপরন্তু, ছায়ানট ও উদীচীর ন্যায় সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহও একই মানবতা ও মিলনের জয়গান গাহিয়া থাকে।

দুর্ভাগ্যজনক হইল, অতীতের কোনো সরকারই এহেন উগ্রবাদী মহলটিকে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর কোনো চেষ্টা করে নাই, যে কারণে ২৭ বৎসর চলিয়া গেলেও উদীচী বোমা হামলার বিচার হয় নাই; দীর্ঘ সিকি শতক পর রমনার বোমা হামলার বিচার একভাবে হইলেও উহাকে ন্যায়বিচার বলিতে অনেকে কুণ্ঠিত বোধ করেন। অধিকতর উদ্বেগজনক হইল, এই উগ্রবাদী মহল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে আশীর্বাদ ভোগ করিয়াছে, বর্তমানে তাহার অবসান ঘটিয়াছে এমনটা বলা যায় না। এই কারণে গত সাত মাসেও বিভিন্ন মাজার, আখড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সহিংস হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। আমাদের প্রত্যাশা, লালনের আখড়াবাড়িতে টাইম বোমা পাওয়ার পর সরকারের সম্বিৎ ফিরিবে; যথাযথ তদন্ত-পূর্বক এই ঘটনার হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনিবার পাশাপাশি ইতোপূর্বে সংঘটিত সকল উগ্রবাদী সহিংসতার বিচার করা হইবে।
 

আরও পড়ুন

×