ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

শিশুচোর সন্দেহে প্রহারে হত্যা

জীবন রক্ষার স্থাপনায় জীবনঘাতী কর্মকাণ্ড!

জীবন রক্ষার স্থাপনায় জীবনঘাতী কর্মকাণ্ড!
×
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১০

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুচোর সন্দেহে যেইভাবে একজনকে প্রহারের মাধ্যমে হত্যা করা হইয়াছে, উহা যদ্রূপ বেদনাদায়ক তদ্রূপ বিক্ষোভ-জাগানিয়া। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার হাসপাতালটির শিশু বিভাগের সম্মুখে ঘোরাঘুরির কারণে চোর সন্দেহে তাঁহাকে প্রহার করা হইলে গুরুতর আহত হইয়া বৃহস্পতিবার তাঁহার মৃত্যু হয়। আরও উদ্বেগের বিষয়, গুরুতর আহত হইলেও তিনি উপযুক্ত চিকিৎসা পান নাই। চিকিৎসাহীন অবস্থায় তাঁহার প্রাণহানি ঘটিয়াছে। যেই হাসপাতাল গড়িয়া উঠিয়াছে জীবন বাঁচাইবার নিমিত্তে, সেইখানে এইরূপ প্রাণহানি সমাজে মানবিকতার ঘাটতির নূতন মাত্রা যুক্ত করিল বটে।

বস্তুত, দেশে প্রায়শ ছেলেধরা বা শিশুচোর সন্দেহে নিরীহ মানুষ যদ্রূপ গণপ্রহারের শিকার হইয়া প্রাণ হারাইতেছে, তদ্রূপ ধর্মীয় ও সামাজিক বিবিধ কারণেও এহেন হত্যা থামিয়া নাই। গত সপ্তাহেই আমরা সাতক্ষীরায় যুবক হত্যায় এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে উদ্বেগ জানাইয়াছি। সন্দেহবশত কিংবা গুজবে আস্থা স্থাপন করিয়া অপরাধী সাব্যস্ত এবং শারীরিক নির্যাতনের অঘটন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সাল হইতে চলতি বৎসর অবধি মব সহিংসতায় অধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়াছে। আমরা মনে করি, যাচাই-বাছাই কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের অবকাশ না দিয়াই এক দল মানুষ যেই প্রকারে কাহারও প্রাণ সংহার করিতেছে, উহা সমাজের স্বাভাবিকতা লইয়াই প্রশ্ন তুলিতে বাধ্য। এহেন নিষ্ঠুরতা কেবল মানবাধিকারের লঙ্ঘন নহে, আইনের শাসনের দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ।

আমরা বিস্মিত, রাজধানীতে অবস্থিত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ন্যায় বৃহৎ স্থাপনায় কীভাবে গণপ্রহারে হত্যার ঘটনা ঘটিতে পারে! তথায় সর্বক্ষণ রোগী ও স্বজনরা যদ্রূপ অবস্থান করেন, তদ্রূপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণও থাকেন। এমনতর স্থানে শিশুদের নিরাপত্তা লইয়া সন্দেহজনক যেই কোনো বিষয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ অস্বাভাবিক নহে। শিশু অপহরণ কিংবা পাচারের ন্যায় অপরাধের আশঙ্কা থাকিলে উহা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা লওয়া জরুরি। কিন্তু উক্ত উদ্বেগকে পুঁজি করিয়া গুজবের বিস্তার কিংবা কোনো ব্যক্তিকে শিশুচোর আখ্যা দিয়ে গণপ্রহার কাম্য নহে। বস্তুত, সন্দেহ কখনও অপরাধের প্রমাণ হইতে পারে না। কোনো ব্যক্তি অপরাধ সংঘটিত করিয়াছে কিনা, উহা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার। বিক্ষুব্ধ জনতার হস্তে বিচার তুলিয়া দিবার অর্থ হইল ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিই অস্বীকার। আমরা চাহি, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করিয়া আইনি বেষ্টনীতে আনয়ন করা হউক। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করিতে হইবে। তবে নিরপরাধ কেহ যেন হয়রানির শিকার না হন, উহাও নিশ্চিতকরণ জরুরি।

দুঃখজনক হইলেও সত্য, আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লওয়া কিংবা মব সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান ঘোষণা করিলেও সমাজে উহার প্রতিফলন দৃশ্যমান নহে। তৎকারণে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলির সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গুজবের বিপদ, নাগরিক দায়িত্ব এবং আইনের শাসনের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করিতে হইবে। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি ঘিরিয়া সন্দেহের উদ্রেক করিলে তাহাকে প্রহার না করিয়া পুলিশকে খবর দেওয়া প্রয়োজন। ইহার সহিত শিশু নিখোঁজ হইবার ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং অভিযোগের কার্যকর তদন্তের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×