বাল্যবিবাহ
সমাজের কর্কট ব্যাধি সারিবে না?
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
আইন প্রণয়ন, সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম; কোনো কিছুই যে দেশে বাল্যবিবাহ নামক ব্যাধির নিরাময় করিতে পারিতেছে না– জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্য উহার প্রমাণ। জাতিসংঘের এই সংস্থার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশে ২০ হইতে ২৪ বৎসর বয়সী নারীর ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিবাহ হইতেছে ১৮ বৎসর পূর্ণ হইবার পূর্বেই; ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিবাহ হইয়াছে ১৫ বৎসর পূর্ণ হইবার পূর্বেই। সামাজিক এই প্রবণতাকে ‘ব্যাধি’ বলিবার কারণ বাল্যবিবাহের নেপথ্যে রহিয়াছে দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কার, লিঙ্গবৈষম্য এবং কন্যাশিশুকে পরিবারের বোঝারূপে বিবেচনার মানসিকতা। বাল্যবিবাহের প্রকট রূপটি উদ্বেগজনক; সন্দেহ নাই। কিন্তু উহাতে বিস্মিত হইবার উপাদান সামান্যই। কারণ, বাল্যবিবাহের হার করোনাকাল হইতেই বৃদ্ধি পাইতে শুরু করিয়াছিল। ইতোপূর্বে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশ– ঐ হার আর হ্রাসমান নহে।
বলা বাহুল্য, বাল্যবিবাহের পরিণতি সুদূরপ্রসারী। অল্প বয়সে বিবাহ হইলে অধিকাংশ কন্যার পড়াশোনা বন্ধ হইয়া যায়; অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হইবার পথ সংকুচিত হয়; সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা হ্রাস পায় এবং পরিবারে নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হইলেও তৎপরিস্থিতি হইতে উত্তরণের সক্ষমতা দুর্বল হইয়া পড়ে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ মাতা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কীরূপে বৃদ্ধি করে, উহা নূতন করিয়া কহতব্য নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন বলিতেছে, ১৫-১৯ বৎসর বয়সী কিশোরীদের অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ৫৫ শতাংশের পরিণতি হয় গর্ভপাত। যাহা উদ্বেগজনক, বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ হারের দেশগুলির অন্যতম বাংলাদেশ। আমাদের স্মরণে রহিয়াছে টাঙ্গাইলে বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরী নুর নাহারের কথা। বিবাহের ৩৪ দিনেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মেয়েটির প্রাণপ্রদীপ নির্বাপিত হইয়াছিল। তাহার বিবাহ নিবন্ধিতও ছিল না। এইরূপ অসংখ্য ঘটনা প্রায়শ ঘটিয়া থাকে এই দেশব্যাপী।
সন্দেহ নাই, দেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন রহিয়াছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষের ন্যূনতম বয়স ২১ বৎসর এবং নারীর ক্ষেত্রে ১৮ বৎসর। আইনে বাল্যবিবাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য শাস্তির বিধানও বর্তমান। তবে আইন থাকাই যে যথেষ্ট নহে– তাহা প্রতিটি জরিপেই প্রমাণিত। জন্মনিবন্ধনে বয়স জালিয়াতি, গোপনে বিবাহ সম্পন্ন, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া এবং অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা আইনকে দুর্বল করিয়া দেয়। শিশুর শৈশব হরণ করিয়া কোনো সমাজ উন্নতির শিখরে আরোহণ করিতে পারে না। বাল্যবিবাহে শুধু একজন শিশুর জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত নহে; দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চক্রও প্রজন্ম হইতে প্রজন্মে কদর্য অস্তিত্ব ঘোষণা করে। উহারই সাঁড়াশিসদৃশ আক্রমণ কর্কট ব্যাধির ন্যায় সমাজের প্রতিটি স্তরেই নেতিবাচক চাপ রাখিতেছে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন প্রচার আর সাময়িক অভিযান যতখানি কার্যকর ফল দিবে, তাহা হইতে অধিক প্রয়োজন ধারাবাহিক ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ গ্রহণ। আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশ ও অভিভাবকের সম্মতি সাপেক্ষে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিবাহের বিশেষ বিধান রহিয়াছে বটে, উহার অপব্যবহার প্রতিরোধ অত্যাবশ্যক।
দারিদ্র্য বাল্যবিবাহের অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের কন্যাদের জন্য শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করিতে হইবে। উপবৃত্তি, নিরাপদ যাতায়াত, বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ এবং মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করিতে হইবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরিয়া পড়া হ্রাসে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একযোগে উদ্যোগী হইতে হইবে। পরিবর্তন আনিতে হইবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের দায় শুধু কন্যাশিশু বা তাহার পরিবারের নহে। পুত্রশিশু, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদিগের এই প্রচেষ্টায় যুক্ত করিতে হবে। বিবাহের বয়স, প্রজনন স্বাস্থ্য, সম্মতি, শিশুর অধিকার এবং বাল্যবিবাহের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি লইয়া আরও সচেতন না হইলে এই কর্কট ব্যাধি হইতে সমাজের মুক্তি মিলিবে না সহজে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়