বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবে অতিথিরা
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল জাতি গঠনে জোর
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:০৮
বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে, তখন প্রশ্ন থেকে যায়- আমরা কতটা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হয়ে উঠতে পেরেছি? গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্বের অনেক দেশ এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সে জায়গায় এখনও পিছিয়ে রয়েছে। তরুণদের মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং কিংবা সহিংসতার পথে যেতে দেওয়া যাবে না। পরিবর্তে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো এবং ভিন্নমতকে সম্মান জানানোর মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের ঢাকা-২ বিভাগীয় প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা এসব কথা বলেন। শনিবার রাজধানীর পান্থপথে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল একাডেমিতে বিজ্ঞান বিতর্কের এই আসর অনুষ্ঠিত হয়। ‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’ প্রতিপাদ্যে প্রতিযোগিতার এই পর্বে নারায়ণগঞ্জ ও রাজবাড়ীসহ ঢাকা মহানগরের ১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। এর মধ্যে ৮টি দল বিজয়ী হয়ে চূড়ান্ত পর্বে সুযোগ পায়।
দেশজুড়ে প্রতিযোগিতা শেষে এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ের উৎসব শেষ হলো। বিভাগীয় পর্যায়ে বিজয়ী ১৬ দল নিয়ে আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে এবং সমকালের পাঠক সংগঠন সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে ১২তম আসরের পাওয়ার্ড বাই স্পন্সর হিসেবে রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
শনিবার বেলা ১১টায় উৎসবের উদ্বোধন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী, সাবেক বিতার্কিক রাশেদুল ইসলাম পল্লব এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল একাডেমির সহকারী পরিচালক মুজিবুর রহমান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, বিএফএফ-সমকাল ১২ বছর ধরে বিজ্ঞান বিতর্কের আয়োজন করছে। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনেক শিক্ষার্থী তৈরি হয়েছে, যাঁরা দেশ-বিদেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করছে, তখন প্রশ্ন থেকে যায়- আমরা কতটা বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হয়ে উঠতে পেরেছি? গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিশ্বের অনেক দেশ এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সে জায়গায় এখনও পিছিয়ে।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং কিংবা সহিংসতার পথে যেতে দেওয়া যাবে না। হাতুড়িবাহিনী ও মব সংস্কৃতির পরিবর্তে বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশ দেখতে চাই। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আগামীর তরুণ প্রজন্ম দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিতর্ককে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই ২০১৩ সালে সমকাল ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ উদ্যোগ শুরু করে। পরবর্তী প্রজন্মকে বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিবছর ৫২০টি স্কুলকে এ আয়োজনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, যুক্তি, মতপ্রকাশ ও বহুমতের চর্চার ক্ষেত্রে আমরা কঠিন সময় পার করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি মানুষ কথা বললেও অন্যের কথা শোনার প্রবণতা কমছে। মানুষ নিজের মতের সঙ্গে মেলে, এমন কথাই গ্রহণ করছে; ফলে ভিন্নমত ও অন্যের যুক্তি গুরুত্ব হারাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিএফএফ-সমকাল বিজ্ঞান বিতর্কের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য ভিন্নমতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং অন্যের যুক্তি শোনার মানসিকতা তৈরি করা। বিতর্কের সঙ্গে সাংবাদিকতার মিল রয়েছে; উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তি, তথ্য ও মতপ্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। বিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যে দক্ষতা অর্জন করে, তা শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পরও কাজে লাগে। বিতর্কে আসলে পরাজয় বলে কিছু নেই।

ঢাকা বিভাগীয় পর্বে বিতর্কের বিষয় ছিল- প্রযুক্তিনির্ভরতা ও সৃজনশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের ভূমিকা এবং টেকসই উন্নয়নে বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগের গুরুত্ব। এ ছাড়া ডিজিটাল আসক্তি রোধে শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ থাকা উচিত কি না, তা নিয়েও পক্ষে বিপক্ষে ক্ষুরধার যুক্তি তুলে ধরেন ক্ষুদে বিতার্কিকরা।
প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন- কৃতি বিতার্কিক ফুয়াদ হাসান, মেহেদী হাসান, আজম খান, মুসা, ফাহিম শাকিল, মাসনুন, সিয়াম হাসান, জান্নাতুল নাইম, শাওন শাহরিয়ার, সুহা, পিয়াস, আল আমিন ও দুর্বার আদি।
বিজয়ী দলগুলো হলো- মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকার শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা হাই স্কুল, হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুল, সাভারের সেনা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজবাড়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ আইডিয়াল স্কুল।
প্রতিযোগিতায় আরও অংশ নেয়- বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বি এইচ খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ঢাকা নৌবাহিনী কলেজ।
- বিষয় :
- বিতর্ক উৎসব
- বিতর্ক
- গবেষণা
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা