ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মনস্তত্ত্ব

প্রাণীর প্রতি মমত্ব একটি মানবিক গুণ

প্রাণীর প্রতি মমত্ব একটি মানবিক গুণ
×

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১৭:১৫

আমার কৈশোর কেটেছে দিনাজপুর শহরে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৪। আমাদের সাত ভাই-বোনের পুলিশ কর্মকর্তা পিতা মাঝে-মধ্যে যেতেন 'মফস্বলে'। কিছুটা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম ওটা হচ্ছে সরকারি কাজের তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য জেলা সদর থেকে নিম্নস্তরের প্রশাসনিক এলাকা ও থানাগুলো পরিদর্শন। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় তখন জেলা নয়, মহকুমা ও একটি থানা। দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত বলে বাবার মফস্বলের মধ্যে ছিল দেশের সর্ব উত্তরের তেঁতুলিয়া এবং বোদা, রানীশংকৈল নেকমর্দ। দাঁড়ান, এই নামটিতে এসে আমার স্মৃতির গাড়ি থেমে যায়। কারণ ওই জায়গা থেকে সরাসরি ফিরলে বাবার জিপে আসত সাধারণের চেয়ে বড় আকারের গরুর আস্ত রান। তখন ফ্রিজ না থাকলেও মাংস জ্বাল দিয়ে দিয়ে মিটসেফে রেখে ক'দিন খাওয়া চলত। গরু-খাসির মাংসের চেয়ে অধিক সুস্বাদু কিছু নয়, তবে 'নীলগাই' শব্দটি আকৃষ্ট করেছিল, যে পশু আমরা কখনও দেখিনি। ওই অঞ্চলে পর্যাপ্ত। তখন জেনেছিলাম, এগুলো গৃহপালিত নয়, বন্য গরু। তবে তখন আমাদের জানা অনেক বাকি ছিল।

রোজার ছুটিতে একবার দৌলতদিয়ায় ফেরি থেকে নেমে বাস ধরতে নদীতীরে বালুর ওপর দিয়ে হাঁটছি। চোখে পড়ল অদূরে একটা জটলা। কলরব শোনা যাচ্ছিল. আক্রোশের বা উল্লাসের। কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে দেখি কয়েকজন বালকসহ কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও একটি শুশুককে লাঠি ও লাথি দিয়ে মেরে চলেছে। প্রাণীটি মরে গেছে অথবা মৃতপ্রায়। 'কেন মারছেন, কেন মারছেন শিশুটাকে, থামেন থামেন' বলে বিরত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে প্রায় কান্না চাপতে চাপতে সরে এসেছিলাম। প্রাণীটি বয়সে শিশু না, শুশুককে আমরা শিশু বলতাম। মিঠা পানির ডলফিন। পদ্মায় প্রচুর ছিল। শৈশবে গ্রামের নানা-দাদাবাড়িতে নৌকায় যেতে তখন ভাঙ্গার কাছে কুমার নদেও দেখেছি শুশুক। নদীর টলটলে পানিতে চেয়ে থাকলে হঠাৎ পানির ওপর পিঠ দেখিয়ে অ্যাক্রোব্যাটিক্স করে শুশুক মুহূর্তে ডুবে যেতে দেখলেই আমরা 'শিশু শিশু' বলে হাততালি দিয়ে উঠতাম। সেই নদ প্রায় মরে গেছে।

শুশুক ও নীলগাই। প্রথমটি বাংলাদেশে বিপন্ন। দ্বিতীয়টি বিলুপ্ত। প্রাণী দুটি জাতিসংঘ স্বীকৃত 'আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নে'র (আইইউসিএন) লাল তালিকায় এভাবেই চিহ্নিত। শুশুক রক্ষার জন্য সুন্দরবন ও পদ্মা-যমুনায় কয়েকটি অভয়াশ্রম প্রকল্প আছে। নীলগাই বাংলাদেশে বিলুপ্ত হলেও সংলগ্ন ভারতীয় এলাকায় প্রাণীটি আছে এবং সীমান্ত পেরিয়ে মাঝে-মধ্যে দু-একটি চলে আসে। ভারতে প্রাণীটি বিপন্ন তালিকাভুক্ত। শৈশবে জানতাম না যে, নীলগাই গরু নয়, হরিণ জাতীয় প্রাণী। জীববিজ্ঞানের শ্রেণীবিন্যাসে এন্টিলোপ বা সারঙ্গ বা কৃষ্ণসার হরিণের মধ্যে তালিকাভুক্ত।

গত ২ জুলাই ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় ইউনিয়নের মুক্তারবস্তি গ্রামে একটি বাচ্চা নীলগাই মরে পড়ে আছে মানুষের জটলার মধ্যে। সীমান্তঘেঁষা নাগর নদী পেরিয়ে চলে এলে সেটিকে গ্রামের মানুষ ধাওয়া করে। বহু ছোটাছুটি করে অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে প্রাণীটি মারা যায়। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার শৌলা দোগাছিতে একটি নীলগাইকে ধরে মানুষজন মাংস খাবে বলে জবাই করার মুহূর্তে সীমান্তরক্ষী বিজবির সদস্যরা উদ্ধার করে বন বিভাগের হাতে দিয়েছিল। প্রাণীটি গাভির মতো দেখতে হলেও গ্রামবাসী বলেছে, তাদের কাছে অপরিচিত।

কেউ কেউ কেন এত হিংস্র? শুশুক খুবই নিরীহ। আমার স্মৃতির শুশুকটি চরে উঠে পড়েছিল হয়তো রোদ পোহাতে। মানুষ পিটিয়ে মারল। শুশুক জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। গঙ্গা অববাহিকার নদীগুলোতে বেশি শুশুক দেখলে বুঝতে হবে জলের গুণ ভালো। আর শুশুক থাকলে মাছ বেশি থাকে। শুশুক মাছই খায়, তবে সেই মাছ খায়, যে মাছগুলো অন্য ছোট মাছ খায়। তাই ভারসাম্য থাকে। ঔষধশিল্পের জন্য শুশুকের চর্বির তেলের বিক্রয়মূল্য থাকায় জেলেরা জাল দিয়ে শিকার করত এবং নদীতে আড়বাঁধ দেওয়া, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত যান্ত্রিক জলযান চলাচল প্রভৃতি কারণে শুশুক বিলুপ্তপ্রায়। আর উত্তরাঞ্চলের নীলগাই বিলুপ্ত হয়েছে বন কেটে সাফ করে ফেলার জন্য। প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাই প্রাণিজগতের প্রধান ভূমিকা। ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে অতিকায় হাতি পর্যন্ত এই ভূমিকা পালন করে। আমরা ভেবে দেখি না, কাদায় যে তুচ্ছ কেঁচোকে আমরা পায়ের বুড়ো আঙুলে পিষে মারি, সেই কেঁচো ফসলের জন্য মাটির উর্বরতা রক্ষায় বিশাল ভূমিকা পালন করে। শহুরে শৌখিন মানুষ ছাদবাগান বারান্দা-বাগানের জন্য প্যাকেটে ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার কিনে আনে। কিন্তু সেইসব পরিবারের শিশুরা জীবিত কেঁচো সম্পর্কে বস্তুত কিছুই জানে না। মানুষ বুদ্ধিমান, ভূপৃষ্ঠে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সভ্যতা নির্মাণকারী প্রাণী বলে অন্য ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব প্রাণীকে নিজের কাজে লাগায়। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিনাশ মানুষের বেঁচে থাকার পরিবেশকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ বছর বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত নানা দেশে অভাবিত ঝড়-বন্যা, করোনা বৈশ্বিক মহামারির যাতনা ইত্যাদি থেকে বাস্তবেই টের পাচ্ছি। তবে হুঁশ হচ্ছে না। জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানুষের জন্যই পৃথিবীকে মনোরম বাসোপযোগী রাখতে প্রয়োজন। এই জ্ঞান ও সচেতনতার নিদারুণ অভাব আমাদের। যখন দেখি শিশুরা খেলাচ্ছলে কোনো ইঁদুরের লেজে বা বিড়ালছানার গলায় দড়ি বেঁধে টেনেহ্যাঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ও তাতে আনন্দ পাচ্ছে এবং বড়রা তাদের নিবৃত্ত করছে না, তখন বুঝি কী ভয়াবহ ঔদাসীন্য আছে আমাদের সমাজে পশুর প্রতি মমত্ব বিষয়ে। হ্যাঁ, স্কুলপাঠ্য বইয়ে এ বিষয়ে রচনা পাঠের ব্যবস্থা আছে। 'জীবে দয়া করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর' বলে অনেক অনেক মহাজনবাক্য আছে। কিন্তু আমরা তো শিশুদের সামনেই খোলা জায়গায় মুরগি, হাঁস, খাসি, গরু জবাই করি এবং হাতের রক্ত লুঙ্গিতে মুছি। তাহলে শিশুর সংবেদনশীলতা কেন তৈরি হবে?

পশুর প্রতি নির্দয়তা রোধে আমাদের একটি পুরোনো দুর্বল আইন আছে, যার প্রয়োগ কার্যত নেই। কিছু এনজিও পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার পক্ষে কাজ করে। কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যোগী তরুণ-তরুণীকে করোনা মহামারির লকডাউনে রাস্তার ক্ষুধার্ত কুকুরদের খাদ্য দিতে দেখা গেছে। গৃহপালিত গরুটিকে কোরবানির হাটে বিক্রির সময় বিক্রেতা ও তার শিশু পুত্র-কন্যা পশুর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, এই সংবাদচিত্রও আমরা দেখেছি। ক্ষণেকের হৃদয়াবেগ তৈরি হয়। তবে ব্যক্তিপর্যায়ের এই দৃষ্টান্তগুলো মোটেই প্রাণীকে ভালোবাসা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার চেতনা সামাজিকভাবে প্রোথিত হওয়ার প্রমাণ নয়। আমাদের গুরুত্ব দিয়ে শিশু মনস্তত্ত্বে, স্কুলশিক্ষায়, পারিবারিক আচরণে, সংস্কৃতিতে ও সামাজিক চেতনায় প্রাণিকুলের প্রতি মমত্ব ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতে হবে।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×