ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

নদী রক্ষা কমিশন

দায়-দায়িত্বহীন শুধুই সুপারিশকারী সংস্থা!

দায়-দায়িত্বহীন শুধুই সুপারিশকারী সংস্থা!
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

সারাবিশ্বের পরিবেশবাদী মানুষ নদী রক্ষার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে। পরিবেশের সঙ্গে পানির গুরুত্বপূর্ণ সংযোগই কি এর একমাত্র কারণ! নাকি নিজেদের জীবন-জীবিকায় নদীর অসীম গুরুত্ব বিবেচনায় মানুষ তা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ? বাংলাদেশে প্রবাহিত পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রসহ প্রধান প্রধান নদনদীর উৎসমুখ ভারতে। প্রাগুক্ত নদীগুলো ছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। ভৌগোলিক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় ভারত এসব নদীর উজানে কৃত্রিম বাঁধ, অপরিকল্পিত গ্রোয়েন, অপ্রয়োজনীয় স্লুইসগেট কিংবা আড়িবাঁধ দেওয়া, গতিপথ পরিবর্তন করা কিংবা শুস্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখা আর বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যমূলক আগ্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের নদীগুলোর জীবন টালমাটাল করে দিয়েছে। সৃষ্ট পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসতে যে ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল, তা কি দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পকরা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়েছেন? প্রয়োজনীয় সময়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন, এমন নজিরও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। বিভিন্ন সময়ে উঠে আসা সংবাদে তারা নড়েচড়ে বসেছে ঠিকই, তবে তা থামতেও সময় লাগেনি। এতে দেশের প্রধান প্রধান নদী দিন দিন বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। আর ছোট ছোট নদী এর প্রভাবে নদী থেকে খালে, খাল থেকে নালায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ছে। পরিবেশবাদীদের দাবির মুখে বিভিন্ন সময় নদী সংস্কার করা হলেও তা স্বরূপে আর ফিরে আসছে না। উৎসমুখে পানির নিশ্চয়তা না থাকায় সে সংস্কার সাফল্যের মুখ দেখেনি, দেখছে না এবং দেখবে না। অথচ পরিকল্পকরা এমন সংস্কারের মধ্যেই নিবেদিত হয়ে আছেন। নদীগুলো কিছুদিনের জন্য দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে; পরিবেশের ওপর প্রভাব রাখছে; মানুষের জীবন-জীবিকায় সহায়ক ভূমিকা দেখাচ্ছে। কিন্তু তা অচিরেই পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।

ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় নদীগুলোর বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। গজলডোবা ব্যারাজ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর পানিপ্রবাহে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করায় নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। ত্রিপুরায় খোয়াই ও মনু নদীতে বাঁধ নির্মাণ, কুশিয়ারার উৎসমুখে বরাক বাঁধ নির্মাণ, ব্রহ্মপুত্রের পানি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে চীন। বাংলাদেশের নদীগুলোর স্বাভাবিকতা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে প্রযুক্তির কাছে। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ছন্দকে বাধাগ্রস্ত করা, পানিপ্রবাহ যথানিয়মে না চলার কারণে নদী হারাতে বসছে তার ঢাল, প্রশস্ততা, গভীরতা ও পলির পরিবহন ক্ষমতা। অথচ এসবের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলাই নদীর ধর্ম। স্থানবিশেষে তা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কিন্তু যে কোনো কারণে একটায় পরিবর্তন হলে অন্যগুলোর পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। দেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নদী শাসনের নামে প্রকৌশলগত অবকাঠামোয় নদীকে বশে রাখার উদ্যোগ নদীর জীবনকালকে কীভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা বিবেচনার দাবি রাখে। ভিন্ন ভিন্ন গতি-প্রকৃতির নদীকে অভিন্ন পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদী মানুষ নদীকে তার আপন গতিতে ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। দাবি উঠেছে নদীকে তার অতীতে ফিরিয়ে দেওয়ার। প্রযুক্তির বন্ধনমুক্ত করে নদীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ছন্দ ফিরিয়ে আনার কথাও শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা আবেগতাড়িত হয়ে নদী রক্ষার কথা ভাবছেন। কিন্তু আমাদের দেশে নদী জনগণের সম্পদ হিসেবেই বিবেচিত। এখানে সবাই নিজের মতো করে নদীকে ব্যবহার করে মাত্র। নদীকে রক্ষা করার দায়িত্ব কেউ গ্রহণ করে না। সে কারণে পরিকল্পনার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। তাই নদী রক্ষায় সর্বপ্রথম নদীর মালিকানা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নদীর যে কোনো ব্যবহার মালিক নিয়ন্ত্রিত হওয়াও জরুরি। 


পরিবেশবাদীদের দাবির মুখে সরকার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করেছে। কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- ক. নদীর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কার্যাবলির মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে সরকারকে সুপারিশ করা; খ. নদীর অবৈধ দখলমুক্ত এবং পুনর্দখল রোধ বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ প্রদান; গ. নদী এবং এর তীরে স্থাপিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ প্রদান; ঘ. নদীর পানি দূষণমুক্ত রাখার বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ প্রদান; ঙ. বিলুপ্ত বা মৃতপ্রায় নদীর খনন বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ প্রদান; চ. নদী সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার উন্নয়নে সরকারকে সুপারিশ প্রদান; ছ. নদী উন্নয়ন সংক্রান্ত সরকারের কাছে যে কোনো সুপারিশ প্রদান; জ. নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণে সরকারকে সুপারিশ প্রদান; ঝ. নদী রক্ষাকল্পে স্বল্প ও দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা গ্রহণে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান; ঞ. নদী রক্ষার্থে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান; ট. নিয়মিত পরিদর্শন এবং নদী রক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিবীক্ষণক্রমে সুপারিশ প্রদান; ঠ. নদী রক্ষাসংশ্নিষ্ট বিদ্যমান বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার ব্যবহারিক প্রয়াগ পর্যালোচনাক্রমে ও প্রয়োজনবোধে ওই আইন ও নীতিমালা সংশোধনে সরকারকে সুপারিশ; ড. দেশের খাল, জলাশয় এবং সমুদ্র উপকূল দখল ও দূষণমুক্ত রাখার বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করা।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে সর্বমোট ১৩টি ক্ষেত্রে সরকারকে সুপারিশ করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। দায়িত্ব বিশ্নেষণে দেখা যায়, কমিশনের কার্যক্রম শুধু সরকারকে সুপারিশ করার মধ্যে সীমিত। এমনকি কমিশন নদীর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কার্যাবলির মধ্যে সমন্বয়ও করতে পারবে না। তারা শুধু সরকারকে সুপারিশ করতে সক্ষম।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন-২০১৩ অনুযায়ী ৫ আগস্ট ২০১৪ থেকে গঠিত কমিশন নদী রক্ষায় কাজ করে চলেছে। সরকার কমিশনকে একটা সুপারিশকারী সংস্থা হিসেবে গঠন করার কারণে কমিশন রাজধানীর ঠান্ডা ঘরে বসে সুপারিশের ডালি সাজিয়ে সরকারকে তা প্রদান করে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে কারও সুপারিশ শোনার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি আছে কিনা, তা বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। কেউ কারও কথা শুনতে চায় বলে মনে হয় না। সারাদেশে প্রতিদিন যত তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়ে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে তাদের সুপারিশ কেউ না দেখে, না শোনে, না বাস্তবায়ন করে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় কি? সুপারিশের অংশবিশেষ বাস্তবায়ন সার্বিক কল্যাণ বা সমস্যার সমাধান করতে পারে না। তাই নদী কমিশন বিগত বছরগুলোতে যেসব সুপারিশ রেখে চলেছে, তাতে নদী রক্ষা করা যায়নি এবং আগামীতে তাতে এমনটা আশাও করা যায় না। দেশের নদী রক্ষায় কমিশনের কোনো দায় নেই। সাধারণ মানুষ এমন দায়-দায়িত্বহীন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন চায়নি। প্রত্যাশা ছিল নদীর দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সংস্থা। নদীসংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যারা নদীকে ব্যবহার করে, তাদের ওপর কর্তৃত্বকারী সংস্থা। যে সংস্থার অনুমতি নিয়ে দেশের নদীগুলো ব্যবহার করা যাবে। নদীর মালিকানা থাকবে সংস্থার কাছে। সাধারণ মানুষ নদী সংক্রান্ত যে কোনো জবাবদিহিতা পাবে সংস্থার কাছ থেকে। সরকার কি কোনোভাবে এই জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নামক সুপারিশকারী সংস্থাকে নদীর মালিকানা সংস্থায় রূপান্তর করে দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে না? কমিশনকে যতদিন মালিকানা না দেওয়া যাবে, ততদিন এটা জনকল্যাণে নিয়োজিত সংস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। 

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠিত হওয়ার পর থেকেই দেশের সব নদীর তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ করছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার আগামীতে নদীকে জানতে, বুঝতে সহায়ক হবে। আশু সমস্যার আশু সমাধান নয়। পরিকল্পিতভাবে সমস্যা সমাধানের পথ সৃষ্টি করবে। কমিশন সম্প্রতি সারাদেশের নদী দখলের একটা চিত্র প্রকাশ করেছে। জানি না, সারাদেশের দখলকৃত অংশ দখলমুক্ত হলে নদী তার প্রকৃত আয়তন ফিরে পাবে কিনা! যশোর শহরের ভৈরব নদ সংস্কারের সময় দেখা গেছে ৪০ মিটার প্রশস্ত করেও খনন করা যাচ্ছে না। নদীর জায়গা নেই। অথচ এককালের প্রমত্ত ভৈরব নদের জমিতে এত আকাল পড়ার তো কথা নয়। নদটি সরকারিভাবে দখলমুক্ত হওয়ার পরও ৪০ মিটার প্রশস্ত করে সংস্কার করা যাচ্ছে না। এ চিত্র শুধু ভৈরব নদের ক্ষেত্রে নয়। সারাদেশের নদীগুলোর দিকে তাকালে একই প্রশ্ন সামনে আসবে। আমরা জানি না, এ প্রশ্নের উত্তর কার কাছে পাওয়া যাবে? জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কি সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে অতীত থেকে বিশ্নেষণ ও গবেষণা করে এসে তারপর প্রশ্নের উত্তর দেবে? সরকারের কাছে দাবি, দেশের নদী যদি সত্যিকার অর্থে রক্ষা করতে হয় তাহলে কমিশনকে মালিকানা দিয়েই দায়িত্ব দিতে হবে।

এম আর খায়রুল উমাম:প্রাবন্ধিক; সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও পড়ুন

×