ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

পরিবেশ

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আত্মঘাত বন্ধ হোক

জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আত্মঘাত বন্ধ হোক
×

আফতাব চৌধুরী

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

পৃথিবী জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার। বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। আর জলাভূমি হলো জীববৈচিত্র্যের সুপার মার্কেট। আমাদের দেশ জৈব-ভূতাত্ত্ব্বিক পরিমণ্ডলে হওয়ায় উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের অবস্থান অনেকটা ইন্দো-মালয়ান এবং ইন্দোচীনের সঙ্গে মিল রয়েছে। পৃথিবীজুড়ে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হওয়ার রয়েছে নানা কারণ। যেমন- ক. জীবের স্বাভাবিক বাসস্থান হ্রাস ও বিভাজন, খ. বিদেশি প্রজাতির অনুপ্রবেশ, গ. বিরোধী প্রজাতির অনুপ্রবেশ, ঘ. সমুদ্রের অতিরিক্ত ব্যবহার, ঙ. বায়ু, পানি, মাটি-দূষণ, চ. নিবিড় কৃষিকাজ, ছ. এক ফসলি চাষ। বহু প্রজতির প্রাণী মানুষের অবিবেচক কাজের ফলে এরই মধ্যে চিরতরে বিলুপ্ত। এ ছাড়াও অসংখ্য প্রজাতি রয়েছে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
প্রশ্ন হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যকে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? আসলেই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রকৃতির বৈচিত্র্যের ওপর। বাঁচার জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর করতেই হবে। অক্সিজেন, পানীয় জল, খাবার জোগান দেয় প্রকৃতি। বিদ্যুৎ, লৌহ, কাগজ কিংবা বস্ত্রশিল্পের কাঁচামালও আসে প্রকৃতি থেকে। ইকোট্যুরিজম ব্যবস্থার ওপর বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল। উদ্যান পালন, পোষ্য জীব পালন, পাখির আবাস, চিড়িয়াখানা, অভয়ারণ্য ইত্যাদি না থাকলে সম্ভব নয়। জীবের ক্রমবিবর্তনের ধারা কিংবা উন্নত জাতের উদ্ভিদ বা প্রাণীর সৃষ্টি বিজ্ঞানের যাবতীয় গবেষণা, সেও জীববৈচিত্র্য-নির্ভর প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে জীববৈচিত্র্যের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
দূষণ কমাতে পারে কাক-শকুনসহ অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ও কীটপতঙ্গ। ভূমিক্ষয় রোধ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে উদ্ভিদ। কত পাখি ফসলের কীটপতঙ্গ খেয়ে রাসায়নিক কীটনাশকের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করছে, এর হিসাব কি আমরা করি? এক গবেষণায় জানা যায়, জীববৈচিত্র্যের সংকটের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এই অর্থ যদি ব্যয় করা না হতো তাহলে তা দিয়ে ৮৬ কোটি ২০ লাখ মানুষকে ছ'বছর বিনা কাজে খাওয়ানো যেত। এশিয়ার গ্রামীণ এলাকায় ৮০ শতাংশ মানুষের রুটি-রুজি আসে ওই জীববৈচিত্র্য থেকে।


বাংলাদেশে বেশ কয়েক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখা যায়। একটি সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে ১০ শতাংশ উদ্ভিদ এ দেশেই জন্মায়; পৃথিবীর অন্য কোথাও তা পাওয়া যায় না। উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে নিজস্ব ফুলের গাছই বেশি। বাংলাদেশে ব্যাঙ জাতীয় উভচরের ১০ শতাংশ এ দেশের নিজস্ব নথিভুক্ত। এ দেশের খাদ্যশস্যের ১০টি প্রজাতি, ৫০টি ফলের প্রজাতি, ২৫টি সবজি ও ডালশস্যের প্রজাতি, ৮টি তন্তুশস্য প্রজাতি, বেশ ক'টি মসলার প্রজাতি ও তৈলবীজ প্রজাতি। এ ছাড়াও চা, কফি, ইক্ষু ও তামাকের বহু বন্য প্রজাতি আছে। সারাদেশে কয়েকশ বন্য প্রজাতির শস্য জাতীয় প্রজাতি ছড়িয়ে আছে। পৃথিবীতে যে ১২টি মেগা ডাইভারসিটির দেশ আছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের স্থান অন্যতম। বিশ্বের প্রধান ইকো সিস্টেমগুলোর প্রায় সবক'টির দেখা পাওয়া যায় এ দেশে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের প্রায় ৫০টি প্রজাতির গৃহপালিত পশু এবং ২০টি প্রজাতির বন্য প্রজাতি ব্যবহার করছি। কিন্তু আশার কথা, অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণীর নতুন নতুন প্রয়োজনে ব্যবহারের কথা আজ আলোচিত হচ্ছে। জীব প্রযুক্তিবিদ্যার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে জীবকে নতুন ও ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে রপ্তানিকারী পদার্থের প্রায় ১০ শতাংশ জীব প্রজাতি থেকে আহরিত। জীববৈচিত্র্যের আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীর মধ্যে এমন এক জায়গায় রয়েছে, যা সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
১৯৯২ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এক শীর্ষ সম্মেলন থেকেই জৈববৈচিত্র্য রক্ষার প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে সামনে আসে। পৃথিবীতে কত রকমের জীব আছে, তার সমষ্টি আজও অজানা। কোনোদিন জানা যাবে কিনা, তাও অনিশ্চিত। পৃথিবীতে ৫০ লাখ থেকে ৩০০ লাখ বিভিন্ন জীব-প্রজাতি বাস করে বলে অনুমান। এদের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ প্রজাতি শনাক্ত করা গেছে। এর মধ্যে কীটপতঙ্গ সাত লাখ ৫১ হাজার, অন্যান্য প্রাণী দুই লাখ ৮১ হাজার, সপুষ্পক উদ্ভিদ দুই লাখ ৫০ হাজার, ছত্রাক ৬৮ হাজার, শ্যাওলা ২৬ হাজার ৯০০ প্রোটিস্ট। এককোষী ও উপনিবেশকারী ৩০ হাজার, ব্যাকটেরিয়া চার হাজার ৮০০, ভাইরাস এক হাজার ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের নানা অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতি বছর গড়ে ২৭ হাজার প্রজাতি ধ্বংস হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এমনটা চললে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। এই আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতেই হবে।
আফতাব চৌধুরী: বৃক্ষরোপণে জাতীয় পদকপ্রাপ্ত পরিবেশকর্মী

আরও পড়ুন

×