ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

টিআইর ধারণা সূচক

শুধু বাগাড়ম্বরেই দুর্নীতি কমে না

শুধু বাগাড়ম্বরেই দুর্নীতি কমে না
×

এম হাফিজ উদ্দিন খান

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২২ | ১৩:২৮

বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতার চিত্র উঠে এসেছে দুর্নীতির ধারণা সূচকে। বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) 'দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই)-২০২১' প্রতিবেদনে যে তথ্য পাওয়া গেল, তা দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের অঙ্গীকার-প্রত্যয়ের বিপরীত। দুর্নীতির ধারণা সূচকে এবারও বাংলাদেশের স্কোর ২৬। দেখা যাচ্ছে, একই স্কোর বাংলাদেশ পেয়ে আসছে বিগত চার বছর ধরে। টিআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ এগিয়েছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৭তম। এই তথ্য বিশ্নেষণে বলা যায়, বাংলাদেশ দুর্নীতির চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ কথা বলার অবকাশ নেই- দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকার-প্রত্যয়ের সুফল মিলছে।

দুর্নীতি সমাজের অন্যতম ব্যাধি। সরকারের অনমনীয় অবস্থান তো বটেই, একই সঙ্গে যারা আইন প্রয়োগসহ সমাজে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের যূথবদ্ধ নির্মোহ অবস্থান ভিন্ন এ থেকে পরিত্রাণের পথ নেই। বাংলাদেশের সূচক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আটটি জরিপ ব্যবহূত হয়েছে। দেশের অনেকেই বলতে পারেন, সেবা নিতে কিংবা সুবিচার চাইতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা চিত্র উঠে আসছে। দুর্নীতি যেমন হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন স্তরে, তেমনি হচ্ছে সামাজিক পরিসরেও। আমরা দেখেছি, করোনাদুর্যোগে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি আরও অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়ম-দুর্নীতির মচ্ছব। আর্থিক খাতে সৃষ্টি হচ্ছে একের পর এক ক্ষত। এ অবস্থায়ও আমাদের মতো দেশগুলোর সরকারের এমন প্রবণতা আছে, অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে না নিয়ে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির উৎস সন্ধানে নিষ্ঠ না হয়ে উল্টো কথা বলার।
এর ফলে সমাজে অশুভ কিংবা অকল্যাণের ছায়াই বিস্তৃত হয়। আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি কম হয়নি। কিন্তু উন্নয়নের সুফল সবার ঘরে পৌঁছেনি। আমাদের অনেক সম্ভাবনাই দুর্নীতি নস্যাৎ করে দিচ্ছে তাও মিথ্যা নয়। ক্ষমতাবান কিংবা বলবানদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, রাজনীতির নামে কারও কারোর অপরাজনীতির পথে হাঁটা, অনেকেরই ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্রতাসহ নানারকম অভিযোগ আছে- যেগুলো দুর্নীতির পথ সংকুচিত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই করে আরও প্রশস্ত। দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ২-৩ শতাংশ ক্ষতি হয়, তাও টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে। অভিযোগ আছে, দেশের সেবা খাতগুলো অধিক দুর্নীতিগ্রস্ত। সরকারি সেবা খাতে ঘুষ অন্যতম উপসর্গ। দুর্নীতি প্রতিরোধে দেশে আইন আছে। আছে রাজনৈতিক অঙ্গীকারও। কিন্তু যারা সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়ন করবেন, তাদের কেউ কেউ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত- এরও নজির ইতোমধ্যে কম দৃশ্যমান হয়নি।


কোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজে যদি দুর্নীতি জীবনাচারের অংশ হয়ে যায়, তাহলে উন্নতি যতই হোক তা যে টেকসই হবে না- এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নাগরিকদের স্বাধীনতা, তাদের অধিকারের পথে প্রতিবন্ধকতাহীনতা আধুনিক সভ্য সমাজের ভূষণ। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন-অগ্রগতির সুফল সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছায় না, ক্ষমতাবানরা লুটেপুটে খান। বাস্তবতা অস্বীকার করে কিংবা এড়িয়ে কখনোই কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছা সম্ভব নয়। বরং বাস্তবতা তা যত কঠিনই হোক, এর যথাযথ প্রতিকারের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রতিবিধান। আমরা যে পর্যন্ত না জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেব, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারের চর্চার পথ সুগম করতে না পারব, ততক্ষণ সব আশাই থেকে যাবে দুরাশার গণ্ডিবদ্ধ। দুর্নীতি প্রতিরোধে সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। নির্মোহ রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ করা অসম্ভব।

রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে হিসাবদিহিতা-জবাবদিহিতা-দায়বদ্ধতা কতটা অপরিহার্য, এর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নতুন করে বলা নিষ্প্রয়োজন। যদি এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের অঙ্গীকার শুধু অঙ্গীকার হয়েই থাকবে। ভুলে যাওয়া অনুচিত, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আমাদের জাতিগত কিংবা রাজনৈতিক সুস্পষ্ট কিছু অঙ্গীকার ছিল। আমরা গত বছর স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবণজয়ন্তী উদযাপন করলাম। ৫০ বছর একটি জাতির জন্য কম সময় নয়। কিন্তু সত্য হচ্ছে, আমাদের অনেক অর্জনেরই বিসর্জন ঘটিয়েছে দুর্নীতি এবং সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে- তা এখনও আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। মনে রাখা দরকার, কোনো উদ্যোগেরই সুফল মিলবে না, যদি যথাযথভাবে বিধি কিংবা সরকারি নীতির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জোরালো না হয়। সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এর কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসনের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা-শুদ্ধাচার-জবাবদিহির যে কথা বলা হচ্ছে, এর বাস্তবায়ন অবশ্যই অপরিহার্য।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই শুধু নন; রাজনীতিক, সরকারের নীতিনির্ধারক, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সব জনপ্রতিনিধির সম্পদের হিসাব নেওয়া জরুরি। এ বিষয়ে এ পর্যন্ত কথা কম হয়নি। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই। উদ্যোগ-আয়োজনেই অনেক কিছু গণ্ডিবদ্ধ থেকে যাওয়া আমাদের সার্বিক প্রেক্ষাপটে বড় সমস্যা। আমাদের স্মরণে আছে, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল- মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সব জনপ্রতিনিধি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু তাদের ক'জন জনসমক্ষে হিসাব দাখিল করেছেন জানি না। নির্বাচনী ইশতেহার অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারনামা। রাজনীতি ও দেশের প্রয়োজনেও অপরিহার্য দলিল। কিন্তু আমাদের দেশে এও যেন শুধু কাগজে দলিল হয়েই থাকে। এমনটি নির্বাচনী অঙ্গীকারের বরখেলাপ। জনগণের সঙ্গে উপহাসের শামিল। এর কুফল বহুমুখী হতে বাধ্য।

সুশাসন, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন নিয়ে কথা এ পর্যন্ত কম হয়নি। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন কতটা দৃশ্যমান? এ প্রশ্নের উত্তরও প্রীতিকর নয়। ভুলে গেলে চলবে কী করে যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণই সব ক্ষমতার মালিক। আমাদের সংবিধানেও এর সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, রাজনীতির কর্ণধাররা অনেক ক্ষেত্রেই জনগণকে রাখেন অন্ধকারে। আর এ জন্য দুর্নীতির ছায়া সরে না উপরন্তু আরও বিস্তৃত হয়। ফের প্রশ্ন উঠতে পারে, দুর্নীতি রোধে 'শূন্য সহিষ্ণুতা'র সুফল কোথায়? সমতা কিংবা ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা উচ্চারিত হয় বটে কিন্তু এর বাস্তবায়ন কতটা কী হয়েছে বিদ্যমান বাস্তবতার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর উত্তর। অনিয়ম-দুর্নীতির উৎসে হাত দিতে হলে রাজনৈতিক দৃঢ়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নির্মোহ অবস্থান নিয়ে যে কোনো কদাচারের প্রতিকারে নিষ্ঠ হওয়া। এমন প্রত্যাশা জনগণ করলেও তাদের সামনে তেমন কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য দৃষ্টান্ত নেই।

দুর্নীতি করেন কারা? নিশ্চয়ই যার বা যাদের ক্ষমতা আছে কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতি করে পার পেয়ে যাওয়ার রাস্তা বের করার উপায় যাদের আছে, তারাই দুর্নীতি করেন। তাই অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে হলে হাত দিতে হবে একেবারে উৎসে। এ নিয়েও কথা কম হয়নি, কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়। উৎস অস্পর্শিত রেখে সুফলের আশা দুরাশা মাত্র। যদি উৎসে হাত দিয়ে রাঘববোয়ালদের লাগাম টেনে ধরা না যায় তাহলে দুর্নীতির চক্রে আমাদের ঘুরপাক খেতেই হবে। বিদেশে অর্থ পাচার, সেকেন্ড হোম গড়ার মতো কদাচারের আরও কত দৃষ্টান্তই তো রয়েছে সামনে। কিন্তু এসবের প্রতিকারে দৃষ্টান্ত কয়টি আছে আমাদের সামনে? এ অবস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধে অঙ্গীকার কতটা সুফল দিতে পারে? সর্বাগ্রে দরকার সুশাসন। সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে প্রত্যয় বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করা কঠিন হবে না।

এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আরও পড়ুন

×