ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আবাসিক হলে সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে করণীয়

আবাসিক হলে সুষ্ঠু পরিবেশ ফেরাতে করণীয়
×

আজিজুর রহমান

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

স্যার এ এফ রহমান হলে একজন ছাত্র হত্যার প্রেক্ষাপটে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০১০ সালের ২৫ এপ্রিল আমাকে ওই হলের প্রাধ্যক্ষ নিয়োগ দেন। ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত আমি ওই পদে ছিলাম। শুরুতেই আমি কর্মরত আবাসিক বা সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে সক্রিয় করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচনা করি। বিভিন্নভাবে বোঝাই, ছাত্রদের কক্ষ পরিদর্শন করে নিয়মিত হাজিরা রেকর্ড করার বিষয়টি ওই হলে উপেক্ষিত। কর্মরত শিক্ষকদের সঙ্গে সভায় জানালাম। অতঃপর সপ্তাহে তিন-চার দিন, প্রতিদিন রাত ৮টা-১০টার মধ্যে কমপক্ষে এক ঘণ্টার জন্য তাদের নিজেদের সুবিধামতো হলকে ফ্লোর বা ব্লকে ভাগ করে নিয়ে ছাত্রদের কক্ষ পরিদর্শনে যেতে হবে এবং প্রতিটি কক্ষে অবস্থানরত ছাত্রদের হাজিরা নিতে হবে। অনুরূপ বাঁধাধরা নিয়মে দায়িত্ব পালনে তারা অভ্যস্ত নন মনে হওয়ায় তাদের বললাম, প্রথমদিকে আমিসহ সবাই মিলে একসঙ্গে হলের ভেতরে বিভিন্ন ফ্লোরে ঘুরব এবং ছাত্রদের থাকা-খাওয়া সরেজমিন দেখব ও তাদের কোনো অভিযোগ থাকলে তা রেকর্ড করে নিয়ে আসব। পরবর্তী সময়ে আমি হাজিরা খাতা তৈরি করে দেব এবং সেটা অনুসরণ করে নিয়মিতভাবে তারা ছাত্রদের কক্ষে উপস্থিতি রেকর্ড করবেন।
হলের অভ্যন্তরে আমাদের প্রাথমিক ঘোরাঘুরি থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা গেল। হলে বিপুলসংখ্যক অছাত্র ও মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রের অবস্থান, সিট বরাদ্দ ব্যবস্থা অকার্যকর, প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের দ্বারা তিন-চারটি কক্ষকে গণরুমে রূপান্তর, নিয়মবহির্ভূতভাবে নেতাসহ গণরুমের সদস্যদের হলের ডাইনিং রুমে বা ক্যান্টিনে বিনা পয়সায় খাওয়া ইত্যাদি। হলে অবস্থানরত ছাত্রদের নাম, কক্ষ নম্বর, অধ্যয়নরত বিভাগ, শ্রেণি, সেশন ইত্যাদি অনুযায়ী কোনো হালনাগাদ তালিকা রয়েছে কিনা, তা অফিস স্টাফদের কাছে জানতে চাইলে স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায়, হলে অবস্থানরত ছাত্রদের উপরোক্ত তথ্য এবং বার্ষিক ও চূড়ান্ত পরীক্ষার তারিখসহ হালনাগাদ তালিকা তৈরির জন্য সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলাম। হলের ছাত্রদের কাছ থেকে নিয়মিত সিট রেন্ট সংগ্রহ করা হয় কিনা জানতে চাইলে নেতিবাচক উত্তর পাওয়া গেল।
পরবর্তী সময়ে আমি সন্ধ্যার পর হল অফিসে বসে কক্ষ পরিদর্শন খাতার নমুনা তৈরি, ছাত্রদের উদ্দেশে মাসিক ভিত্তিতে সিট রেন্ট পরিশোধের নোটিশ প্রদান, অবৈধ বা ছাত্রজীবনের মেয়াদোত্তীর্ণ ছেলেদের হল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। চার সিটের একটি কক্ষে চারজনের অধিক ছেলে না থাকা, হলের ডাইনিং রুম (মেস) অথবা প্রাইভেট ক্যান্টিনে খাওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে চলা ইত্যাদি বিষয়ে নোটিশ প্রদান এবং তা ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা নিলাম। পাশাপাশি হলের মেস ও প্রাইভেট ক্যান্টিনে ছাত্রদের খাওয়ার ব্যবস্থাপনা সরেজমিন দেখা এবং এসব বিষয়ে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে আমি দুপুরে বা রাতে খাওয়ার সময় মেস ও ক্যান্টিন আকস্মিক পরিদর্শন শুরু করলাম। যে কোনো সময় হলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে আমরা শৌচাগারের অবস্থা এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও স্বচক্ষে দেখতাম ও সুইপার বা ক্লিনারদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতাম। আমি নিয়মশৃঙ্খলার পথে এগোনোর চেষ্টা করছি দেখে অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ নেতারা সাধারণ ছাত্রদের আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে।
সমস্যায় পড়তে হয় মেয়াদোত্তীর্ণ নেতাদের হল থেকে বিতাড়ন করা নিয়ে। আমার দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পর আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের দ্বারা ছাত্রদের কক্ষ পরিদর্শন প্রায় নিয়মিত হয়ে ওঠা এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ প্রতিপালনের ব্যাপারে ছাত্রদের ঘন ঘন নোটিশ প্রদানের ফলে দীর্ঘদিন থেকে হলে অবস্থানকারী মেয়াদোত্তীর্ণ অছাত্ররা নিজে থেকেই হল ছেড়ে চলে যেতে থাকে। তবে, বিশেষ করে সরকারদলীয় দু'জন মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রনেতাকে নিয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হয়। তাদের একজন ছিল আমার মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এবং অপরজন দর্শন বিভাগের। তাদের ব্যাপারে আমি উপাচাযর্কে জানাই। হলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এই দু'জনকে হল থেকে বিতাড়ন অত্যাবশ্যক এবং এ জন্য সুবিধামতো সময়ে পুলিশ ফোর্স পাঠিয়ে হল প্রশাসনকে সাহায্য করতে অনুরোধ করি।
একদিন দুপুর বেলা খবর পেলাম, মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র তার কক্ষে অবস্থান করছে। আমি হলে পুলিশ পাঠানোর অনুরোধ জানাই; একই সঙ্গে আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের হল অফিসে ডেকে পাঠাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই হলে উপস্থিত হওয়া পুলিশ কনস্টেবলদের একটু দূরত্ব রেখে আমাদের পেছন পেছন আসতে বলে চার-পাঁচজন আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকসহ আমরা সম্ভবত তৃতীয় বা চতুর্থ তলার একটি কক্ষে যাই এবং ওই ছেলেটিকে পেয়ে যাই। আমাকে দেখামাত্র সে পূর্বদিকের বারান্দার গ্রিল টপকে মুহসীন হলের মাঠে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করলে একজন সহকারী আবাসিক শিক্ষক জাপটে ধরেন এবং পুলিশের হাতে তুলে দিই। মনোবিজ্ঞান বিভাগের ওই প্রাক্তন ছাত্রটি হলে টিকতে না পারায়, সাধারণ ও নিয়মিত ছাত্ররা বিশৃঙ্খলায় জড়াতে কিছুটা নিরুৎসাহিত হয়। সেই অবস্থায় রেজা নামে দর্শন বিভাগের অনিয়মিত ছাত্রটি নেতৃত্বে চলে আসে। ইতোমধ্যে কতিপয় অবৈধ ছেলের রাত ১টা-২টার পর হলের গেস্টরুমে এবং মধ্যরাতের পর টিভি কক্ষে ঘুমিয়ে পড়া বন্ধ করতে রাত ১০টার পর গেস্টরুম এবং রাত ১২টার পর টিভি কক্ষ তালাবদ্ধ করার নির্দেশ দিই। এতে দর্শন বিভাগের ওই অনিয়মিত ছাত্রটি হলে অবস্থানরত অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ছেলেদের হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার প্রয়াস পায়। এক রাতে আমি যখন আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে হলের অভ্যন্তরে রাউন্ড শেষে নিচে নামলাম, তখন রেজাদের সংগঠনের (ছাত্রলীগ) ঢাবি শাখা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদকসহ বেশকিছু ছেলে আমাকে ঘেরাও এবং আমার পদত্যাগ দাবি করে।
ইতোমধ্যে আমরা ডাইনিং হল, ক্যান্টিন এবং শৌচাগারে নজরদারি বৃদ্ধির মাধ্যমে সেখানকার অবস্থা কিছুটা উন্নত করতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং ছাত্রদের সক্রিয় সহযোগিতা পেলে এ অবস্থার আরও উন্নয়ন সম্ভব হতো। আমাদের গৃহীত আরও কিছু পদক্ষেপ সম্পর্কে সভায় অবহিত করা হয়। গণরুম ভেঙে দেওয়া হবে, চার সিটের একেকটি কক্ষে চারজন ছাত্রই থাকবে, টিভি কক্ষ এবং হল গেস্টরুম যথাক্রমে রাত ১২টা ও রাত ১০টায় তালাবদ্ধ করার নির্দেশ আগেই দেওয়া হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ছেলেদের হল থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেওয়ার পর যেসব সিট খালি হবে তার বিপরীতে যথাযথ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্যার এ এফ রহমান হলের সংশ্নিষ্ট ছাত্রদের মধ্য থেকে একটি নীতিমালা অনুযায়ী হলে আবাসিকতা প্রদান করা হবে এবং অতঃপর ফান্ড পাওয়া সাপেক্ষে হলে নিয়মিত খেলাধুলা, গান-বাজনা, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। এক দিন দুপুরে খবর পাই, পূর্বোক্ত দর্শন বিভাগের অনিয়মিত ছাত্র রেজা তার কক্ষে একা অবস্থান করছে। তৎক্ষণাৎ উপাচার্যকে হলে পুলিশ পাঠানোর অনুরোধ জানাই এবং আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের হল অফিসে ডেকে পাঠাই। পুলিশ আসার পর উপস্থিত শিক্ষকদের নিয়ে রেজার কক্ষে ঢুকে ওকে পুলিশে সোপর্দ করি। এভাবে স্যার এ এফ রহমান হলে অবৈধ অবস্থানকারীদের দখলদারিত্বের অবসান ঘটে।
প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো-সংশ্নিষ্টদের জন্য কিছু পর্যবেক্ষণ দিতে চাই। কেবল একটি বাংলো বা বাসা প্রাপ্তির মুখ্য উদ্দেশ্য থেকে হলে চাকরি করতে না এলে সেখানকার সামগ্রিক পরিবেশ এবং ছাত্রছাত্রীদের জীবনমান উন্নয়নে অনেক কিছুই করা সম্ভব। শিক্ষক হিসেবে আমরা যদি নৈতিক বলে বলীয়ান, নীতিবান, দেশপ্রেমিক হই, তাহলে যে সরকার বা প্রশাসনের আমলেই আমরা কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত হই না কেন, সব ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে সর্বাধিক সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর সর্বোচ্চ কল্যাণার্থে যে কোনো কাজ করতে পারি। প্রাধ্যক্ষ যদি তার নেতৃত্ববলে আবাসিক ও সহকারী আবাসিক শিক্ষকদের নিয়ে একটি টিমওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে নিয়মিত কক্ষ পরিদর্শনের মাধ্যমে হলে কেবল বৈধ ছাত্রছাত্রীদের অবস্থান নিশ্চিত করাই নয়; তাদের থাকা-খাওয়ার জন্য একটি নূ্যনতম স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও সম্ভব। ভবিষ্যৎ নাগরিকদের দীর্ঘদিনের কৃষ্টি-সভ্যতা, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করা, তাদের মধ্যে দেশপ্রেমবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা, নীতি-নৈতিকতাবোধ সৃষ্টি করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত প্রতিটি হল। তাই দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে খেলাধুলা, নাটক-গান-বাজনা, সাহিত্য-বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদির নিয়মিত ব্যবস্থা থাকা উচিত এবং এ জন্য হলগুলোতে প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। হলগুলোর কর্মকাণ্ড ঠিক কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা জানার জন্য প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলে অধিকতর ভালো হয়।
ড. আজিজুর রহমান :অনারারি অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×