ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

এই সার্চ কমিটির পক্ষে প্রশ্নহীন ইসি গঠন সম্ভব?

এই সার্চ কমিটির পক্ষে প্রশ্নহীন ইসি গঠন সম্ভব?
×

এম হাফিজ উদ্দিন খান

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

যে কোনো সমস্যা-সংকট থেকে উত্তরণের একেবারে প্রথম ধাপ হলো, সঠিক পথ বা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আমরা দেখছি, অনেক ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না বিধায় সমস্যা-সংকটের নিরসন তো নয়ই; উপরন্তু বাড়ছে। সম্প্রতি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও সংবিধান অনুসারে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়নের বিষয়টি যেমন বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি, তেমনি নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি গঠন নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে বিতর্কের। প্রশ্ন উঠছে, এই সার্চ কমিটির পক্ষে প্রশ্নহীন কিংবা কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন কমিশন গঠন কি সম্ভব? নির্বাচন কমিশনের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ঘিরে যদি বিতর্ক জিইয়েই থাকে, তাহলে এমন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কী করে সম্ভব নির্বাচনের মতো গণতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গের ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখা? এ রকম প্রশ্ন আছে আরও।
আমরা জানি, প্রতিটি ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আমরা নাগরিক হিসেবে মতামত দেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকারকে পরামর্শ দিতে পারি এবং তা তো দেওয়া হচ্ছেই। কিন্তু সরকার যদি মনে করে, কারও কোনো কথা আমলে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাটাই মুখ্য; তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর কুফল দেখা দেবে আরও প্রকটভাবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তো বটেই যদি যথাযথভাবে স্বচ্ছতার নিরিখে দায়িত্ব পালন করতে না পারে, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এবং দুঃখজনকভাবে দেশে তা এর মধ্যে বহুবার হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠন আইন নিয়ে আমরা সুজনের পক্ষে সংবিধান অনুসারে একটি প্রাথমিক খসড়া তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি।
আমরা ইতোমধ্যে দুটি সার্চ কমিটির পারফরম্যান্স দেখেছি। তাদের কর্মকাণ্ড মোটেও সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ছিল না। কারণ এর প্রধান অন্তরায় ছিল ব্যবস্থা কিংবা প্রক্রিয়া। এবার প্রথম আইনের কাঠামোবলে নির্বাচন কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু এ প্রশ্ন তো আছেই- এই কাঠামোর আইন কি সংবিধান অনুসারে করা হয়েছে?
সরকার শুধু এটুকুই বলতে পারবে, নির্বাচন কমিশন গঠনে তারা আইন করেছে। কিন্তু এটুকু কি তারা বলতে পারবে, দেশের জনগণের যে প্রত্যাশা এবং সংবিধানের নির্দেশিত যে পথ, তা তারা মান্য করছে? তারপরও সরকার আইন প্রণয়ন করল এবং এ আইন অনুসারে গঠিত হতে যাচ্ছে এবারের নির্বাচন কমিশন। যে সার্চ কমিটির মাধ্যমে আগামী নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে, সেই কমিশন জনপ্রত্যাশা পূরণে কতটা পরিপূরক হবে? সরকার যদি জনগণের স্বার্থ ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, তাহলে জনহিতকর কোনো কিছু নিশ্চিত করা কী করে সম্ভব? বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে প্রধান করে ছয় সদস্যের যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে, এ কমিটির ক'জন নিয়োগ পেয়েছেন পদাধিকারবলে? ছয় সদস্যের মধ্যে ক'জনের রয়েছে রাজনৈতিক দলের আদর্শের প্রতি আনুগত্যের পরিচয়? তাছাড়া সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হুসাইনের অতীতে কর্মদক্ষতার পরিচয় মিললেও তিনি যেহেতু একটি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন, সেহেতু তার দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে কতটা নির্মোহ বা প্রশ্নমুক্ত হবে- এ প্রশ্নও থেকে যায়।
সরকার ও সরকারি দলের কেউ কেউ বলেছেন, এ কমিটি অত্যন্ত নিরপেক্ষ। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ অন্য কয়েকটি দল তো বটেই, নাগরিক সমাজের অনেকে এই নিরপেক্ষতার ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন এরই মধ্যে তুলেছেন তা ঠেলে দেওয়ার অবকাশ নেই। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেহতু জনগণই সর্বময় ক্ষমতার মালিক, সেহেতু জনগণকে কোনো ব্যাপারেই অন্ধকারে রাখা উচিত নয়।
'বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়'- এ কথাটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। নবগঠিত সার্চ কমিটির প্রত্যেকের আমলে রাখা দরকার, আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই যেহেতু প্রীতিকর নয়, সেহেতু তারা তাদের অবস্থান ও যোগ্যতার প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদর্শন করে এমন কমিশন গঠন করবেন, যা আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষত উপশমেই শুধু নয়, নির্বাচন কমিশন গঠনেও দৃষ্টান্তযোগ্য হয়ে থাকবে। প্রত্যাশা করি, সার্চ কমিটির প্রত্যেকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে জিইয়ে থাকা সব বিতর্কের নিরসন ঘটাতে সক্ষম হবেন।
দেশে বিগত ৫০ বছরে বিতর্কিত-নিন্দিত নির্বাচনের দৃষ্টান্ত যেমন আছে, তেমন স্বচ্ছ-অবাধ-প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের দৃষ্টান্তও আছে। এই ভালো নির্বাচনগুলো তো নির্বাচন কমিশনই করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে- তারা পারল, তাহলে অন্যরা পারল না কেন? আশা করি, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের জন্য বিবেচিতদের নাম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করার পাশাপাশি গণশুনানির ব্যবস্থা করা হবে ব্যবস্থাটি প্রশ্নমুক্ত করার প্রয়োজনেই।


এ প্রক্রিয়ায় শুধু প্রস্তাবিতদের কর্মদক্ষতা, সুনাম-দুর্নাম সম্পর্কিত সব তথ্যই উঠে আসবে না; যারা এমন পথ রচনা করতে সক্ষম হবেন, তারাও জাতির সামনে অনন্য উচ্চতায় স্থান পাবেন। আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বচ্ছতা-নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণের স্বার্থে সার্চ কমিটির সবার প্রতি আহ্বান, তারা নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করবেন। যারা নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকায় ঠাঁই পাবেন তাদের বাছাই করার কারণসহ অন্য যুক্তিগুলোও সার্চ কমিটিকে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং তাও প্রকাশ করা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থেই। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের প্রস্তাবিত নামের তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার পথ মসৃণে গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করবে- এও প্রত্যাশা।
নির্বাচন কমিশনে নিয়োগপ্রাপ্তির যোগ্যতা হোক দক্ষতা-স্বচ্ছতা-আনুগত্যহীনতা ও ভাবমূর্তির ঔজ্জ্বল্য। সাহসিকতা ও প্রজ্ঞার মতো বিষয়গুলোও হোক মানদণ্ড। সার্চ কমিটি অর্পিত দায়িত্ব পালনে লোক দেখানো ভূমিকা পালন করলে আমাদের জন্য তা আরও বেশি অপ্রীতিকর হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনার পদে যাদের বেছে নেওয়া হবে কিংবা কাদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হবে সেই নাম যাতে নতুন করে আবার বিতর্কের সৃষ্টি না করে; এ ব্যাপারে সার্চ কমিটিকে সজাগ-সতর্ক থাকতে হবে।
আমরা একটা ভালো নির্বাচন কমিশন চাই, যে কমিশন ইতোমধ্যে সৃষ্ট সব ক্ষত উপশম করে ভবিষ্যতের জন্য স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। ন্যায়পরায়ণতা, বস্তুনিষ্ঠতা, গ্রহণযোগ্যতার মতো যেসব জরুরি অনুষঙ্গ হারিয়ে যাওয়ার কারণে নির্বাচন কমিশন নিয়ে জনআস্থার পারদ নেমে গেছে; এ থেকে উত্তরণ ঘটানোর পথ অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি। দায়িত্বশীল কেউই যেন তাদের দায়ভার ভুলে না যান।
এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

আরও পড়ুন

×