ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

নির্বাচন কমিশন গঠন

আস্থা পুনরুদ্ধারের পরীক্ষায় সার্চ কমিটি

আস্থা পুনরুদ্ধারের পরীক্ষায় সার্চ কমিটি
×

এম হাফিজ উদ্দিন খান

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০

সরকার বলেছিল, হাতে যে সময় আছে এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন আইন গঠন করা সম্ভব নয়। তারপর হঠাৎ তড়িঘড়ি করে সরকার আইন প্রণয়ন করল, যা প্রশ্নমুক্ত নয়। সরকার হয়তো বলবে ইসি গঠনে তারা আইন করেছে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা ও সংবিধান অনুসারে আইনটি প্রণীত হয়েছি কিনা এ নিয়ে এরই মধ্যে কথা হয়েছে অনেক। তরপরও এই আইন অনুসারেই গঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এজন্য যে অনুসন্ধান কমিটি গঠিত হয়েছে তাদের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন কমিশন গঠন শেষ পর্যন্ত কতটা সম্ভব হবে- এর জন্য এখন আমরা তাকিয়ে আছি সামনের দিকে। গঠিত সার্চ কমিটির কোনো কোনো সদস্যের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি আনুগত্যের যে অভিযোগ উঠেছে তাতে সন্দেহের দানা আরও পুষ্ট হয়েছে। এই সার্চ কমিটির একজন সদস্য সাবেক নির্বাচন কমিশনার, যিনি অতীতে কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বটে কিন্তু পরে তিনি একটি রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। এমতাবস্থায় সার্চ কমিটি নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে তা অমূলক নয়।
সার্চ কমিটি নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। অতীতে আমরা দুটি সার্চ কমিটির পারফরম্যান্স যা দেখেছি তা মোটেও সন্তুষ্ট হওয়ার মতো ছিল না। ব্যবস্থা কিংবা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে আমাদের অনেক উদ্যোগই বিতর্কিত হওয়ার নজির রয়েছে। যত বিতর্কই থাকুক তারপরও এবারই প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে আইনের কাঠামোবলে। দেশে কয়েকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘিরেই বিতর্ক বেশি। সদ্য বিদায়ী নূরুল হুদা কমিশন এই বিতর্ক আরও বেশি পুষ্ট করে। বিদায়কালেও সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা যেসব কথা বলেছেন তা লজ্জার। কমিশনার মাহবুব তালুকদার বরাবরের মতোই পৃথক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার কথা বলে গেছেন। তাদের ব্যাপারে জনঅভিযোগের বিষয়গুলো মাহবুব তালুকদার অস্বীকার না করলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য জনমতের সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিদায়ী হুদা কমিশন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আগে থেকেই অনেক নেতিবাচক চিত্র উঠে আসছিল। দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকও তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে লিখিত দিয়েছিলেন। দেশের নির্বাচনব্যবস্থায় ধস নামার পেছনে মুখ্য দায় নির্বাচন কমিশনের। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে এই কমিটির প্রত্যেকের আমলে রাখা উচিত, যেহেতু এ ব্যাপারে আমাদের অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয় সেহেতু তাদের নীতি-নৈতিকতার পরীক্ষায় নির্মোহ অবস্থান নিয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে।
তারা যে নামের তালিকা চূড়ান্ত করে সুপারিশ করবেন তাদের প্রত্যেকের নাম, কর্মঅধ্যায় ও প্রস্তাবকদের নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা প্রকাশ করে ব্যবস্থা নিতে হবে গণশুনানিরও। তারা যদি তা না করেন কিংবা জনগণকে অন্ধকারে রেখে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব শেষ করেন তাহলে সৃষ্ট ক্ষতের তো উপশম হবেই না, উপরন্তু আরও ক্ষত সৃষ্টি হবে যা জাতির জন্য হবে অত্যন্ত অকল্যাণকর। তারা আইনের নির্দেশনা মেনে স্বচ্ছতা-নিরপেক্ষতা-দায়বদ্ধতার নীতির পরীক্ষায় পাস করলে তা হতে পারে হূত আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক। এই পরীক্ষায় তারা অসফল হলে এর বিরূপ প্রভাব শুধু নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠবে না, গণতন্ত্রের জন্য তা হবে আরও বড় অশনিসংকেত। আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রাপ্তির ব্যাপারে তারা দক্ষতা-স্বচ্ছতা-আনুগত্যহীনতা-ভাবমূর্তির ঔজ্জ্বল্য এই বিষয়গুলোই মুখ্য উপজীব্য করবেন।
আমরা দেশের নাগরিক হিসেবে ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর (সুজন) পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছি। দেশের আরও বিশিষ্ট নাগরিক ও মহল থেকেও এ ব্যাপারে অনেক পরামর্শ এরই মধ্যে উপস্থাপিত হয়েছে। আমরা চাই, এমন একটা নির্বাচন কমিশন গঠিত হোক যে কমিশন নীতিনিষ্ঠ থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত নির্বাচন ব্যবস্থারই শুধু পুনরুদ্ধার নয় আরও অনেক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনেই সক্ষম হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের গুরুত্ব বিশেষভাবে স্বীকৃত। সরকার কিংবা দেশের অন্য প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীলরা যদি ভিন্নমতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে থাকেন তাহলে সংকট নিরসন তো দূরের কথা, তা আরও ঘনীভূত হবে। এমনটি শুভ বোধসম্পন্ন কারোরই কাম্য হতে পারে না। সম্প্রতি ইউপি নির্বাচনের ধাপে ধাপে শুধু সহিংসতাই নয়, অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার যে নজির স্থাপিত হয়েছে এরও নতুন করে ব্যাখ্যা বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন।


আমাদের সামনে দেশে ভালো নির্বাচনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। নির্বাচন কমিশনই তো ওই নির্বাচনগুলো করেছে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হচ্ছে কেন? শুধু তো নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি যেন সরকারের কোনো বর্ধিত শাখা। আইনগত দিক দিয়ে শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন কেন দলীয় সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচন করতে গিয়ে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে এর কারণ অজানা নয়। এই কারণগুলো নতুন নির্বাচন কমিশনকে যেমন, তেমনি সরকারকেও বিশেষভাবে আত্মস্থ করতে হবে। আগে ব্যবস্থার সব গলদ দূর করা চাই। ব্যবস্থা কিংবা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলে অবস্থা ভালো হতে বাধ্য।
সার্চ কমিটির কাছে এত কিছুর পরও যে প্রত্যাশা, তা হলো তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই ধসে পড়া জনআস্থার পুনরুদ্ধার ঘটুক। নির্বাচনী ব্যবস্থা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে দেশে যেরকম কমিশন গঠন খুব জরুরি হয়ে পড়েছে সার্চ কমিটির সবাই নির্মোহ অবস্থান নিয়ে সেরকম পদক্ষেপ নিলেই মঙ্গল। আমলা, বিচারপতি নাকি অন্য কেউ প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কমিশনার হলেন সেটা বিবেচ্য নয়। মূল কথা হলো, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে স্বচ্ছতা রক্ষা করতেই হবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে সৎ, যোগ্য ও দক্ষদের বিকল্প নেই। যারা দক্ষ ও যোগ্য সংগতই তাদের অভিজ্ঞতাও পুষ্ট হওয়ারই কথা। অনুগ্রহ কিংবা আনুকূল্য পেয়ে কেউ অতীতে বড় দায়িত্ব পালন করেছেন এই বিবেচনায় কাউকে কমিশনে নিয়ে না আসাই বাঞ্ছনীয়। পূর্বনির্ধারিত কোনো ছকে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে- এমন অভিযোগ উত্থাপিত যাতে না হয় তাও সার্চ কমিটিকে আমলে রাখতে হবে।
রাষ্ট্রের যে কোনো বিষয় নিয়ে তামাশার কোনো সুযোগ কারোরই নেই। আমরা জানি, এবারের অনুসন্ধান কমিটির কার্যপ্রণালিতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণের নির্দেশনা আছে। তাদের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে কোনো তথ্য কিংবা পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে কোনোভাবেই অন্ধকারে রাখা উচিত হবে না। পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা নির্ণয়ের নিরিখে সার্চ কমিটিকে প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে হবে। কোনো একটি রাজনৈতিক দল নাকি সার্চ কমিটির কাছে তাদের প্রস্তাবিত নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু তথ্য অধিকার আইনে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে তা যেন দায়িত্বশীল কেউই ভুলে না যান। তথ্যের প্রবাহ অবাধ না হলে সত্য প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ। সার্চ কমিটির সদস্যদের নিশ্চয়ই এসব কোনো কিছুই অজানা নয়। তারা অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে- এও আমাদের প্রত্যাশা।
এম হাফিজ উদ্দিন খান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

আরও পড়ুন

×