নারীর অধিকার
সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন অধরা কেন?
সাদেকা হালিম
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২২ | ০০:২৯
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও সবাই সমগোত্রীয় নয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের ক্ষমতায়ন ঘটেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু অনেকেই নানাভাবে অধিকারবঞ্চিত। তাই এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্যে যথার্থই বলা হয়েছে 'টেকসই আগামীর জন্য জেন্ডার সমতাই আজ অগ্রগণ্য'। দু'দিন পরই আমরা ঐতিহাসিক দিবসটি উদযাপন করতে যাচ্ছি। নারী দিবসের প্রতিপাদ্যে ইকুয়ালিটি বা সমতার কথা বলা হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি শব্দ বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো ইকুইটি। ইকুইটি মানে জেন্ডার ন্যায্যতা। সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় উভয়ই প্রয়োজন। আমরা জানি, উন্নয়ন হলেই হয় না; তা টেকসই হওয়া জরুরি। বর্তমান প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও বেড়ে ওঠার পথ সুরক্ষিত করে; পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি সেই কর্মকাণ্ডই টেকসই উন্নয়ন। নারীর সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে। দেশের নারীর অগ্রযাত্রায় অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন আমাদের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। একাধিক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন নারী। প্রশাসনে সচিব পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বস্তরে নারীর পদচারণা যেমন রয়েছে, তেমনি রাজনীতি এবং সমাজের নানা ক্ষেত্রে নারী আজ প্রতিষ্ঠিত। সব জায়গায় নারীকে এখানে যেভাবে অগ্রাধিকার ও প্রাধ্যান্য দেওয়া হচ্ছে, আগে সেভাবে দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় নেতৃত্বস্থানে নারী এগিয়ে এসেছে। বস্তুত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানে যে চারটি স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা; ওই চারটি স্তম্ভেই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে সেখানেও আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। মাঝখানে আমরা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার দেখেছি। এমনকি নারীকে পেছনে রাখার আইনও এ সময় দেখা গেছে।
দীর্ঘ সময় পর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরে এলেও নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতা সমাজে রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন যেভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল, সেভাবে আমরা পদক্ষেপ নিতে পারিনি। নারী এখনও পরিবার ও সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়। পুরুষের তুলনায় নারী কাজ বেশি করলেও অনেক ক্ষেত্রে নারী যথাযথ পারিশ্রমিক পায় না। তাদের কাজের মূল্যায়ন সর্বত্র সমানভাবে করা হয় না। দেশে দুটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নারী দায়িত্ব পালন করেছেন।
সমতার হিসেবে সরকারি দপ্তরগুলোতে যেভাবে প্রধান রূপে নারী প্রশাসক প্রয়োজন ছিল, সেভাবে এখনও নারীর পদায়ন হয়নি।
বলার অপেক্ষা রাখে না, অনেক ক্ষেত্রে নারীকে আলংকারিক হিসেবে রাখা হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন সাময়িক হিসেবে ঠিক আছে। কিন্তু নারী যাতে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে, সে ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ২৫ লাখ নারী কাজ করে। অন্যান্য কল-কারখানায়ও নারীরা অবদান রাখছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তাদের সুপারভাইজার পুরুষ। ফলে সেখানে নারী যথাযথ অধিকার পায় না। কর্মক্ষেত্রে নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। এমনকি আজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর ঘটনা জেনেছি। এখন আন্দোলন চলছে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবিতে। ও ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আশ্চর্যের বিষয়, সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করলে স্থানীয়দের হামলার শিকার হন। এমনকি 'যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে' বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হামলার নির্দেশ দেওয়া হয় মসজিদের মাইকে। এমনটা মেনে নেওয়া যায় না।
যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারীর নিরাপত্তা না থাকে, তবে কোথায় তারা নিরাপদ থাকবে? আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় সব জায়গা থেকে প্রতিবাদ হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ম্ফূর্ত আন্দোলনে নেমেছে। আমি মনে করি, যে কোনো ধর্ষণের ঘটনায় এমন প্রতিবাদ হওয়া জরুরি। গ্রামের কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলেও সর্বস্তরের এমন আন্দোলন হলে সমাজে একটি জাগরণ তৈরি হবে। তাতে অপরাধীরা ভীত হবে। প্রতিবাদের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রত্যাশা থাকবে, নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় প্রশাসন নিজেই তৎপর থাকবে। আন্দোলন করে অপরাধীদের ধরার দাবি জানানোর আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রয়োজন। আমরা জানি, প্রতিটি থানা সেভাবে নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। যদিও সরকার নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের প্রয়োজনীয় সব সেবা এক স্থান থেকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপন করেছে। সেখানে নারী স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশি ও আইনি সহায়তা, মনো-সামাজিক কাউন্সেলিং, আশ্রয় সেবা, ডিএনএ পরীক্ষার সুবিধা পেয়ে থাকে। দেশব্যাপী নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের সেবাপ্রাপ্তির লক্ষ্যে ৪৭টি জেলা সদর হাসপাতাল এবং ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬৭টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল গঠন করা হয়েছে। আমি মনে করি, সরকারের এসব পদক্ষেপ বিষয়ে যেমন নারীদের অবহিত করতে হবে, তেমনি এসব কেন্দ্রে যথাযথ সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টিও নিশ্চিত করা চাই। 
আমরা জানি, ধর্ষণের শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে নারী মামলা করতে চায় না। তার চেয়েও দুঃখজনক বিষয়, যারা মামলা করছে তারাও যথাযথ বিচার পাচ্ছে না। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে সারাদেশের আদালতে ঝুলে আছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রায় দুই লাখ মামলা। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ মামলা। সাজা পাচ্ছে হাজারে সাড়ে চারজন আসামি। এমনকি যারা মামলা করে, তাদের নানা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। একটা পর্যায়ে বাধ্য হয়েই আপস করে ফেলে অভিযোগকারী। আবার সাক্ষীর আদালতে যেতে না চাওয়া, প্রভাবশালী ধর্ষক দ্বারা ভুক্তভোগীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আপস করার মতো ঘটনাও উল্লেখ করার মতো। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ধর্ষণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলার দ্রুত রায় দেওয়ার মাধ্যমে ইতোমধ্যে এটা প্রমাণ হয়েছে- ইচ্ছা থাকলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তি করা অসম্ভব নয়।
নারী নির্যাতনের নতুন ক্ষেত্র এখন অনলাইন। সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর মধ্যে ৭৯ শতাংশের বেশি কখনও না কখনও অনলাইনে হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে নারী প্রায় ৫৩ শতাংশ। নারী যেভাবে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। ডিজিটাল মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হলেও অভিযোগ করার প্রক্রিয়া জটিল। নারীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থেই অনলাইনে অভিযোগ দেওয়া সহজ ও দ্রুততর করা প্রয়োজন। অনলাইনে যেহেতু মানুষের পদচারণা বাড়ছে, সুতরাং এখানেও নজর রাখতে হবে। আমরা দেখেছি, সরকার ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য 'তথ্য আপা' প্রকল্প চালু করেছে। সেখানে নারীকে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে তারা অতি দ্রুত তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারে এবং তথ্যের সাহায্যে তাদের সমস্যা সমাধানে নিজেরাই দক্ষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
এবার নারী দিবসের প্রতিপাদ্যের আলোকে শুরু করেছি সমতা দিয়ে; শেষেও বিষয়টিতে জোর দিতে চাই। আমি মনে করি, নারীর সমতা নিশ্চিতে পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য সামাজিকভাবে নারীকে দেখার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো জরুরি। পুরুষ যখন নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবে, নারীকে তার অধীন মনে করে এবং নারীর অধিকার ও মর্যাদা তারা সেভাবে মূল্যায়ন করে না। বস্তুত সমাজে নারীর অবদান-অর্জনকে অবমূল্যায়ন এবং পুরুষের অধস্তন পর্যায়ে দেখার কারণেই নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের হার বাড়ছে, যা নস্যাৎ করে দিচ্ছে মানবিক মর্যাদা; সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের সোনালি স্বপ্ন।
ড. সাদেকা হালিম: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ; সাবেক প্রথম নারী ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক প্রথম নারী তথ্য কমিশনার
- বিষয় :
- নারীর অধিকার
- সাদেকা হালিম
