ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

বিগত সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল: সংস্কৃতিমন্ত্রী

বিগত সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল: সংস্কৃতিমন্ত্রী
×

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী

জবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ১৫:৪২

বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক খাত নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিল, যার ফলে গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, যা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের আয়োজনে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র-নজরুল উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, ইতিহাসের সঠিক উপস্থাপন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে জাতির আত্মপরিচয়কে সুদৃঢ় করতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বৈচিত্র্য। সমতল, পাহাড়, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সহাবস্থান দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এই বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের অবদান স্মরণ করে ড. নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, নজরুল সাধারণ ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেও তার অসাধারণ প্রতিভা, বিদ্রোহী চেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অনন্য স্থান অর্জন করেছেন। তার সংগ্রামী জীবন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং শোষণবিরোধী দর্শন আজও সমাজকে অনুপ্রাণিত করে। নজরুলের ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতার জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার প্রতি বিশেষ স্নেহ ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন।

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গভীর মানবতাবোধসম্পন্ন একজন মানুষ, যিনি মানুষের কল্যাণ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন। তার সাহিত্য, দর্শন ও চিন্তাধারা আজও বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ও মানবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে কেন্দ্র করে যৌথ উৎসব আয়োজনের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সময়ে তা কাটিয়ে ওঠার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদান অবিস্মরণীয়। তবে বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত থাকলেও নজরুলচর্চা তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাগরণের কবি, আস্থার কবি এবং অস্তিত্বের কবি। তার সাহিত্য ও দর্শন বাঙালির মুক্তি, সাম্য, মানবতা এবং প্রতিবাদের চেতনাকে ধারণ করে।

উপাচার্য আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল-এই দুই মহাকবির চিন্তা, সাহিত্য ও দর্শনকে একত্রে ধারণ করার মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতিসত্তার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন দেশপ্রেম ও মানবতাবোধ, আর নজরুল শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তাহমিনা আখতার বলেন, সংগীতচর্চা কেবল শাস্ত্রীয় বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর আবেদন সর্বস্তরের মানুষের কাছে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার ও সমাজসংস্কারক ছিলেন এবং তার পল্লী উন্নয়ন ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক। একইভাবে নজরুল সমাজ উন্নয়ন, শান্তি ও আত্মনির্ভরশীলতার চেতনা ধারণ করে সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, এ ধরনের আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও কাব্যধারায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অবদান অনন্য এবং অবিস্মরণীয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মোহাম্মদ আজম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. অণিমা রায়। স্বাগত বক্তব্য দেন সহযোগী অধ্যাপক ড. ঝুমুর আহমেদ এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী অধ্যাপক মো. মাহমুদুর রহমান।

প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান-কে গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

উদ্বোধনী পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আয়োজনে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন বুলবুল ইসলাম, শামা রহমান এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এছাড়া ‘শ্যামল সুন্দর’ পরিবেশন করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ এবং ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা’ যৌথভাবে পরিবেশন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগ, ধৃতি নর্তনালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) অনুষ্ঠিত হবে ‘নজরুল পর্ব’। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ।
 

আরও পড়ুন

×