স্মরণ
‘আমরা’ থেকে ‘আমি’ হয়ে যাওয়ার শূন্যতা
তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ। ছবি: সংগৃহীত
মীর সামী
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৫৯ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩৭
তারেক মাসুদ শুধু একজন নির্মাতাই ছিলেন না; ছিলেন একটি স্বপ্নের নাম। সিনেমাকে ভালোবেসে মানুষটি নিজের জীবন, সময় ও সৃজনশীলতা উৎসর্গ করেছিলেন। তারেক মাসুদের সেই পথচলার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন ক্যাথরিন মাসুদ। সহযাত্রী, সহকর্মী ও জীবনসঙ্গী হিসেবে দীর্ঘদিন পাশাপাশি পথ চলেছেন তারা। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ‘কাগজের ফুল’-এর শুটিং লোকেশন দেখে ঢাকায় ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর নিহত হন।
তারেক মাসুদের আকস্মিক প্রয়াণের পর সেই যৌথ জীবনের গল্প আজ ক্যাথরিনের স্মৃতিতে ফিরে আসে বারবার। কখনও ভালোবাসা হয়ে, কখনও গভীর শূন্যতা হয়ে।
১৯৮৭ সালে তারেক মাসুদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ক্যাথরিনের। সে সময় তারেক নির্মাণ করছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের জীবন, দর্শন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’। সেই পরিচয়ই ক্যাথরিনকে টেনে নেয় সিনেমার এক অচেনা অথচ বিস্ময়কর জগতে। তাঁর ভাষায়, “১৯৮৭ সালে যখন আমি প্রথম তার সঙ্গে দেখা করি, সে তখন ‘আদম সুরত’ বানাচ্ছিল। সেখান থেকেই সিনেমার বিশৃঙ্খল এবং সুন্দর দুনিয়ায় আমার প্রথম পা রাখা।
আমি সিনেমা এবং তারেক। দুজনের প্রেমেই একসঙ্গে পড়েছিলাম।” এরপর শুধু জীবন নয়, চলচ্চিত্রও হয়ে ওঠে তাদের যৌথ পথচলার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একসঙ্গে তারা নির্মাণ করেছেন ‘মুক্তির গান’, ‘মাটির ময়না’, ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘রানওয়ে’সহ গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। তাদের কাছে প্রতিটি সিনেমা ছিল ভালোবাসা, শ্রম ও স্বপ্নের সমন্বয়ে তৈরি একেকটি সন্তানের মতো। ক্যাথরিন বলেন, ‘সিনেমাগুলো ছিল আমাদের সন্তানের মতো। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের মতো ডানা মেলার আগ পর্যন্ত আমরা তাদের পরম যত্নে লালন-পালন করতাম।’
এ ‘আমরা’ শব্দটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে তাদের সম্পর্কের গভীরতা। তারেকের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাথরিনের জীবনও গড়ে উঠেছিল এক যৌথ সত্তাকে ঘিরে। কিন্তু ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর সেই ‘আমরা’ হঠাৎই পরিণত হয় ‘আমি’-তে। ক্যাথরিনের কাছে এই পরিবর্তন ছিল শুধু একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা নয়, বরং জীবনের পরিচিত কাঠামোটিই ভেঙে যাওয়ার মতো। তাঁর ভাষায়, ‘একসঙ্গে পথ চলেছি, কতশত যুদ্ধ পার করেছি। আগে ‘আমরা’ ছিলাম। এখন ‘আমি’ হয়েছি। জীবন চিরতরে বদলে যাওয়ার জন্য এতটুকুই তো যথেষ্ট।’
কথায় কথায় তিনি আরও জানান, তারেকের সঙ্গে কাজের যে বিশেষ বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, সেটিও আর ফিরে আসেনি। ক্যাথরিনের কথায়, “তারেক চলে যাওয়ার পর আমি অন্য কারও সঙ্গে চলচ্চিত্রে কাজ করার সেই বিশেষ ‘ওয়ার্ক-কেমিস্ট্রি’ বা বোঝাপড়াটা আর কোনোদিন খুঁজে পাইনি।”
তবে তারেকের স্মৃতি শুধু ক্যাথরিনের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে থাকেনি। ছেলে নিষাদের কাছেও বাবাকে জীবন্ত করে রাখার দায়িত্ব তিনি নিজের মধ্যে ধারণ করেছেন। তারেক যেন তাঁর সন্তানের কাছে কেবল পুরোনো ছবি বা গল্পের একজন মানুষ হয়ে না থাকেন। এটাই ক্যাথরিনের আকাঙ্ক্ষা। তিনি চান, নিষাদ বড় হয়ে তাঁর বাবার মানুষ হিসেবে পরিচয়, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি উপলব্ধি করুক।
ক্যাথরিন বলেন, ‘আমি চাই নিষাদ তার বাবার উপস্থিতি সবসময় অনুভব করুক। যখন বড় হবে, সে যেন জানতে পারে তার বাবা তাকে কতটা ভালোবাসত এবং তিনি কতটা বড়মাপের একজন মানুষ ছিলেন।’ ক্যাথরিনের এ কথার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন মায়ের পাশাপাশি একজন জীবনসঙ্গীরও দায়বোধ।
আজ তারেক মাসুদ নেই, কিন্তু তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র, তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে। সেই স্মৃতির অন্যতম প্রধান ধারক ক্যাথরিন মাসুদ। তারেকের চলে যাওয়ার পর ‘আমরা’ থেকে ‘আমি’ হয়ে গেলেও, তাদের সৃষ্টির ভেতর সেই ‘আমরা’ আজও রয়ে গেছে। বরেণ্য এ নির্মাতার প্রতি রইল নন্দনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তাঁর চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র
পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা
মাটির ময়না (২০০২)
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বেগের পটভূমিতে তারেক মাসুদের ছেলেবেলার মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে।
অন্তর্যাত্রা (২০০৬)
এটি বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল প্রযুক্তিতে তৈরি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। প্রবাসী জীবন, শিকড়ের সন্ধান এবং আত্মপরিচয়ের জটিলতা এ ছবির মূল বিষয়।
রানওয়ে (২০১০)
২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও জঙ্গিবাদের উত্থানকে কেন্দ্র করে। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-সংলগ্ন রানওয়ের কাছে এক বস্তিতে বসবাসকারী রুহুল নামের এক তরুণ ও তার পরিবারকে ঘিরে এগোয় সিনেমার গল্প। এটি তারেক মাসুদের সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি।
প্রামাণ্যচিত্র ও তথ্যচিত্র
আদম সুরত [১৯৮৯]
প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের জীবন, দর্শন এবং গ্রামীণ বাংলার আবহ নিয়ে নির্মিত তারেক মাসুদের প্রথম ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে তিলে তিলে তৈরি এ কাজটি বাংলাদেশের স্বাধীন প্রামাণ্যচিত্র আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুক্তির গান [১৯৯৫]
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা নামের দলের এ সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের দেশাত্মবোধক ও সংগ্রামী গান শুনিয়ে উজ্জীবিত করতেন। সেই সময় এই শিল্পীদের সঙ্গে থেকে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন এই শিল্পীদের সঙ্গে থেকে লেভিন প্রায় ২০ ঘণ্টার ফুটেজ সংগ্রহ করেন। সেই ফুটেজ থেকেই নির্মিত হয় এই প্রমাণ্যচিত্রটি।
ভয়েসেস অব চিলড্রেন [১৯৯৭]
কর্মজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অধিকার ও জীবনসংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা একটি প্রামাণ্যচিত্র।
ইন দ্য নেম অব সেফটি [১৯৯৯]
মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র।
মুক্তির কথা [১৯৯৯]
‘মুক্তির গান’ প্রদর্শনের সময় সাধারণ মানুষের মুখ থেকে উঠে আসা মুক্তিযুদ্ধের ব্যক্তিগত ও নির্মম অভিজ্ঞতার প্রামাণ্য দলিল।
নারীর কথা [২০০০]
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ত্যাগ, বীরত্ব ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার নারীদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত কাজ।
আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড [২০০২]
ঢাকার পথশিশুদের কঠোর বাস্তবতার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে ধারণ করা একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রামাণ্যচিত্র।
স্বল্পদৈর্ঘ্য ও অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র
সোনার বেড়ি (১৯৮৫
বাংলাদেশের প্রথম ভিডিও স্বল্পদৈর্ঘ্য
ইউনিসন (১৯৯২)
একটি অ্যানিমেশন স্বল্পদৈর্ঘ্য
নরসুন্দর (২০০৯)
১৯৭১ সালের পটভূমিতে নির্মিত একটি প্রশংসিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
- বিষয় :
- তারেক মাসুদ
- নির্মাতা
- মৃত্যুবার্ষিকী