ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মরণ

একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা,একসঙ্গেই থেমে যাওয়া

একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা,একসঙ্গেই থেমে যাওয়া
×

তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর। ছবি: সংগৃহীত

নন্দন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩৫

তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর। এই দুটি নাম যেন একই গল্পের দুই অধ্যায়। একজন ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, অন্যজন ক্যামেরার জাদুকর। একজন গল্প বুনতেন নির্মাণের ভাষায়, অন্যজন সেই গল্পকে দৃশ্যের শরীরে প্রাণ দিতেন। তাদের সম্পর্ক ছিল পেশাগত সীমানা পেরিয়ে গভীর বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা ও সৃজনশীলতার এক অনন্য যুগলবন্দি।

তারেকের সিনেমার বাস্তবতা, মানবিকতা ও স্বকীয় নান্দনিকতাকে দৃশ্যমান করে তুলতে মিশুকের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ক্যামেরাকে তিনি শুধু দৃশ্য ধারণের যন্ত্র হিসেবে দেখেননি; ব্যবহার করেছেন গল্প বলার এক অনন্য শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। তারেকের ভাবনা আর মিশুকের ক্যামেরার এই মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক স্বতন্ত্র দৃশ্যভাষা।

তাদের সৃজনশীল পথচলার অন্যতম মাইলফলক ‘মাটির ময়না’। মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় জটিলতা, সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং নির্মাতার শৈশবস্মৃতির ছায়ায় নির্মিত এই চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সিনেমাকে পৌঁছে দেয় নতুন উচ্চতায়। গল্পের আবেগ, চরিত্রের অন্তর্লোক কিংবা বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতি— সবকিছুই মিশুকের ক্যামেরায় পেয়েছিল আলাদা মাত্রা। 

পরবর্তী সময়ে তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীর মিলে নির্মাণ করেন ‘অন্তর্যাত্রা’ ও ‘রানওয়ে’। এই দুটি সিনেমায় তাদের সৃজনশীল বোঝাপড়া আরও পরিণত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘রানওয়ে’তে সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা, মানুষের অস্থিরতা ও সংকটের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা তাদের যৌথ সৃষ্টিশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তাদের সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল পরস্পরের প্রতি গভীর বিশ্বাস। তারেক জানতেন তিনি কী বলতে চান আর মিশুক জানতেন কীভাবে সেই ভাবনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে হবে। এই বোঝাপড়ার কারণে মিশুকের ক্যামেরা কখনও গল্পকে ছাপিয়ে যায়নি; বরং গল্পের অনুভূতি ও অন্তর্নিহিত অর্থকে আরও গভীর করে তুলেছে।

তারেক ও মিশুকের সম্পর্ককে শুধু পেশাগত সীমানায় আটকে রাখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তারা ছিলেন একই স্বপ্নের সহযাত্রী। সিনেমাকে তারা দেখতেন মানুষের গল্প বলার, সমাজকে বোঝার এবং সময়কে ধরে রাখার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে। একই শিল্পভাবনা ও স্বপ্ন তাদের বন্ধুত্বকে দিয়েছিল গভীরতা আর সেই বন্ধুত্বই তাদের সৃষ্টিশীলতাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে প্রাণ হারান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেটি ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। এক মুহূর্তেই থেমে যায় একজন নির্মাতার স্বপ্নযাত্রা এবং তাঁর সৃজনশীল পথচলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রীর ক্যামেরা।

আজ তারা নেই। নেই সেই দুটি হাসি, নেই নির্মাণস্থলের নীরব কথোপকথন, নেই ক্যামেরার ক্লিক কিংবা পরিচালকের ‘অ্যাকশন’ ডাক। কিন্তু তাদের কাজ রয়ে গেছে। রয়ে গেছে তাদের যৌথ স্বপ্নের দৃশ্যপট। বাংলাদেশের সিনেমায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের নাম তাই শুধু দুই শিল্পীর নাম নয়; এটি একসঙ্গে পথচলা, পারস্পরিক আস্থা এবং অসম্ভব সুন্দর এক সৃজনশীল বন্ধুত্বের গল্পও বটে। আজ তাদের প্রয়াণ দিবসে রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
 

আরও পড়ুন

×