যেভাবে বাংলাদেশ বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পান ফরিদা পারভীন
ফরিদা পারভীন
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৫:৫০ | আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৮:৪০
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিকমাধ্যম অনেকেই শোক প্রকাশ করছেন। গুণী এ শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের সাবেক সহকারী পরিচালক ও আবৃত্তিশিল্পী আশরাফুল আলম। সেই সঙ্গে স্মৃতির পাতা থেকে ফরিদা পারভীনের প্রতিভার এক টুকরো গল্প বলেছেন তিনি।
আজ সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৪ সাল। ফরিদা পারভীনকে ছোটবেলায় গান শেখাতেন কুষ্টিয়া শহরে লালনগীতি শিল্পী মোকসেদ আলী সাঁই। আমি তখন বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে সহকারী পরিচালক পদে কাজ করি এবং মোকসেদ আলী ‘নিজস্ব শিল্পী’ পদে। তিনি একদিন তার ছাত্রীর কথা জানালেন ও অনুরোধ করলেন আমরা যেন তার গান শুনি। আমরা বলতে আমি ও ট্রন্সক্রিপশন সার্ভিসের পরিচালক শহীদুল ইসলাম। তিনি এও জানালেন, মেয়েটি খুব ভাল গান করেন। তাঁকে বললাম মেয়েটিকে নিয়ে আসতে।’
তিনি লিখেছেন, ‘নির্ধারিত দিনে বাবার সঙ্গে ফরিদা পারভীন কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এলেন। মোকসেদ আলী সাঁইসহ আমার অফিস কক্ষে ফরিদা পারভীনের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। ছোট্ট একটা মেয়ে। মনে মনে ভাবলাম ও তো শিশুশিল্পী। তার গান শুনে কী হবে? ট্রন্সক্রিপশনের কোন অনুষ্ঠানে তাকে তো যুক্ত করার কোন সুযোগ নেই। আমি ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ। মোকসেদ আলীকে রুমের বাইরে নিয়ে গিয়ে বললাম, মেয়েটা যে শিশু আগে বলেননি কেন? সে খুব বিব্রত বোধ করল। বলল ভাই, আপনারা তার গান একটু হলেও শোনেন। পরিচালক শহীদুল ইসলামের রুমে গান শোনার ব্যবস্থা করা হল। বিশেষজ্ঞ হিসেবে ছিলেন ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসে কর্মরত সঙ্গীত পরিচালক আব্দুল হালিম চৌধুরী, যিনি গ্রামোফোন কোম্পানির আয়োজনে কবি নজরুল ইসলামের কাছে গান শিখে গ্রামোফোন ডিস্ক প্রকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন।’
_1757843392.jpg)
ফরিদা পারভীনের প্রথম কণ্ঠ শুনে সেদিন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো কক্ষ। পরে সবার অনুরোধে আরও তিনটি গান গেয়েও শোনান ফরিদা। আশরাফুল ইসলামের কথায়, “আমরা সবাই বসে আছি। ফরিদা পারভীন হারমোনিয়ামটা তার দিকে টেনে নিয়ে সামান্য সময় বাজিয়ে গান ধরলেন ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’। গলা ফেলা মাত্র আমরা সবাই স্তম্ভিত ও আপ্লুত হয়ে গেলাম। কী যে কন্ঠস্বর! কী যে গয়কি! কক্ষ জুড়ে সীমাহীন নিস্তব্ধতা। পরপর আরও তিনটি গান গাইল আমাদের অনুরোধে।”
বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের সাবেক সহকারী এই পরিচালক লিখেছেন, “বাবার সঙ্গে গান শোনাতে কুষ্টিয়া থেকে একদিনের জন্য ঢাকায় এসেছিল। আরও এক দিন থাকতে হল ফরিদাকে। ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিস থেকে পাঁচটা গান রেকর্ড করা হল ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘রংধনু’ তে প্রচারের জন্য। অনুষ্ঠানটি ছিল ‘ন্যাশনাল হুক আপ’, যা বাংলাদেশ বেতারের সকল কেন্দ্র থেকে একযোগে সম্প্রচার করা হত এবং অনুষ্ঠানটিতে প্রচার করা হত দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা ও মানসম্পন্ন শিল্পীদের গান। পরের সপ্তাহে ‘রংধনু’ অনুষ্ঠানে প্রচারের এই নীতিমালা ভেঙ্গে ফরিদা পারভীনের পাঁচটি লালনগীতি বিশ মিনিট সময়জুড়ে বাংলাদেশ বেতারের সকল কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল ‘ন্যশনাল হুক আপে’।”
সবশেষে আশরাফুল লিখেছেন, ‘নিয়ম ভেঙ্গে একজন শিশুশিল্পী বড়দের অনুষ্ঠানে গান গাইতে শুরু করে যা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারের ইতিহাসে প্রথম এবং শেষ ঘটনা। ফরিদা পরভীন তখন (১৯৭৪) অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী! তার আত্মার অপার শান্তি কামনা করছি।’

শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফরিদা পারভীন। আজ বেলা ১২টার দিকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ ফরিদা পারভীনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। সেখান থেকে তাঁর মরদেহ নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে; যোহর নামাজের পর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর কুষ্টিয়ায় মা–বাবার কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, লালনের গানের বাণী ও সুরকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। দেশের পাশাপাশি বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরের প্রচারে কাজ করে গেছেন। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে লালনসংগীত পরিবেশন করেছেন। লালনসংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন।
১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ সিনেমার ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ২০০৮ সালে তিনি জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন। লালনশিল্পী হিসেবে সুপরিচিত হলেও, তাঁর কণ্ঠে বেশ কিছু আধুনিক ও দেশের গান জনপ্রিয় হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ ইত্যাদি।
- বিষয় :
- ফরিদা পারভীন
