ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

পারে লয়ে যাও আমায়

পারে লয়ে যাও আমায়
×

ফরিদা পারভীন [৩১ ডিসেম্বর ১৯৫৪ – ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:৪১ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৩:১৫

শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে মারা গেছেন লালন গানের কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীন। তাঁর গাওয়া গান কয়েক প্রজন্মের শ্রোতাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গী। আপন সৃষ্টিকর্ম তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে। তাঁকে নিয়ে তারকাশিল্পীদের শ্রদ্ধাঞ্জলি...

রুনা লায়লা

বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রয়াণ আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করল। তিনি ছিলেন লালনের দর্শন ও গানের এক অনন্য সাধক। যাঁর কণ্ঠে লালনের বাণী নতুন প্রাণ পেত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাত। তাঁর চলে যাওয়া মানে শুধু একজন শিল্পীকে হারানো নয়; বরং এক মহামূল্যবান ঐতিহ্যের ধারক ও বাহককে হারানো। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, শুভানুধ্যায়ী এবং ভক্তদের প্রতি রইল আমার গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা।

খুরশীদ আলম

আশির দশকে ফরিদা পারভীনের সঙ্গে পরিচয় হয় আমার। বেতার থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাঁর সঙ্গে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। মানুষ হিসেবে ছিলেন দারুণ মিশুক। সেই সূত্রে তাঁর লালিত স্বপ্ন সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে তাঁর স্বপ্ন ছিল বিশাল। পুরো বাংলাদেশে লালনগীতির চর্চা হবে; প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জানবে লালন সাঁইয়ের গানের মাহাত্ম্য কী– এই ছিল তাঁর স্বপ্ন। এই স্বপ্ন যে শুধু মনের মধ্যে লালন করেছেন, তা নয়। লালনের গান সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টায় নিবেদিত ছিলেন যুগের পর যুগ। দেশ-বিদেশে যেখানে গেছেন, লালনসংগীত পৌঁছে দিতেও বড় ভূমিকা রেখেছেন। অবাক করা বিষয় হলো, ফরিদা পারভীন আধুনিক ও দেশের গানের শিল্পী হিসেবে শ্রোতা প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কিন্তু যখন থেকে লালনসংগীত গাওয়া শুরু করেছেন, তখন থেকে পুরোপুরি বদলে যেতে শুরু করেছিল তাঁর চিন্তাধারা। লালনগীতি হয়ে উঠেছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান এবং শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার বড় সঙ্গী। তাঁর মতো আর কোনো শিল্পী লালন সাঁইয়ের গান নিয়ে এত কাজ করেছেন বলে আমার জানা নেই। লালনের গানই তাঁকে কিংবদন্তি শিল্পী করে তুলেছে। তাই ফরিদা পারভীনের চিরবিদায়ে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কখনও পূরণ হবে বলে মনে হয় না।

কনকচাঁপা

ফরিদা আপা লালনগীতির যে জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করেছিলেন, পুরো জায়গাটি তিনি শূন্য করে নিজের সঙ্গে নিয়ে গেলেন। যারা লালনগীতি শুনতাম, ফরিদা আপাকেই শুনতাম। মূলত যারা লালনের আখড়ায় গান করেন, তাদের গান এক রকম আর ফরিদা আপার গান আরেক রকম। আখড়া থেকে গান তুলে এনে আপা উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কণ্ঠে মায়া, শুধু লালনের কথা বললে তাঁকে ছোট করা হবে। তাঁর কণ্ঠ অনবদ্য। এককথায় বলতে গেলে, ফরিদা আপার কণ্ঠ তীরের মতো হৃদয় স্পর্শ করত। ভরাট একটা সংগীতাঙ্গন দেখে আমি বড় হয়েছি, সেটাই ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। আমাদের মাথার ওপর যারা বটবৃক্ষের মতো ছিলেন, তাদের আমরা হারিয়ে ফেলছি। আমরা খুবই অসহায় হয়ে যাচ্ছি।

তপন মাহমুদ

লালনকন্যা ফরিদা পারভীন চিরশান্তিতে থাকুন অনন্তলোকে। দেশীয় সংগীতে আপনার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

মাকসুদুল হক

লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও সাধিকা ফরিদা পারভীনের জন্য রইল অসংখ্য ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি। জয়গুরু আলেক সাঁই।

শারমিন সুলতানা সুমি [চিরকুট]

ছোটবেলায় স্কুলের বার্ষিক ছুটির পর যখন গ্রামে যেতাম, আত্মীয়রা সবাই আসত। মামাবাড়িতে গানের আসর বসত। মামা, বোন-ভাইয়েরা নজরুলগীতির তুখোড় শিল্পী ছিলেন। পারিবারিক বন্ধু হিসেবে কেউ একজন সেখানে প্রায়ই আসতেন, যার জন্য সবাই অনেক শ্রদ্ধা নিয়ে, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। দেখতাম, তিনি এলে সবাই খুব খুশি হয়ে যেত, দাঁড়ায়ে সম্মান জানাত। তিনি আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতেন। সব স্বপ্নের মতো লাগত। এই তিনি ছিলেন এই উপমহাদেশের কিংবদন্তি মরমি শিল্পী ফরিদা পারভীন। সৌভাগ্য যে, এভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। তখন আমি খুবই ছোট। অত কিছু মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে, কী গভীর নিমগ্নতায়, উপলব্ধিতে তিনি লালন সাঁইজির গানগুলো গাইতেন, কীভাবে টেনে টেনে কথা বলতেন, খুনসুঁটি করতেন, হাসতেন! 

সম্ভবত আমার দেখা প্রথম এত বড় মানুষ তিনিই। অবাক হয়ে তাঁকে দেখতাম। শুনতাম। পরে দিন যেতে যেতে দেখেছি– জেনেছি আমার মতো লাখো-কোটি মানুষের হৃদয় তিনি ছুঁয়েছিলেন তাঁর কণ্ঠ দিয়ে, লালন ধ্যানে; অপার সাধনায়। সময় পরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। আজকে তাঁর পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার এ বিষণ্ন প্রহরে তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধায় আর সেসব আনন্দ স্মৃতি মনে করে।
 
প্রিন্স মাহমুদ

ফরিদা পারভীনের গাওয়া ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ আর ‘মিলন হবে কত দিনে’– এ দুটি গান আমি পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত একটানা গেয়েছি। সে সময় অনেকেই আমাকে ‘মিলন হবে কত দিনে’ বলে ডাকত। অথচ তাঁকে জানানোই হলো না তাঁর গাওয়া ‘তোমরা ভুলেই গেছো মল্লিকাদির নাম’ গানটি শুনলেই সাত-আট বছরের একটা ছেলে কেঁদে ফেলত। এখনও... বিদায় প্রিয় ফরিদা আপা।

শাকিব খান

লোকসংগীতের দেশবরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি ছিলেন লালনগীতি, নজরুলসংগীত এবং দেশাত্মবোধক গানের এক উজ্জ্বল দীপ্তি। তাঁর কণ্ঠে প্রতিফলিত হতো বাংলার মাটি, মানুষের আত্মা ও সংস্কৃতির স্পন্দন। তাঁর অনন্য সাধনা ও সুরের ছোঁয়া আমাদের হৃদয়ে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পুতুল 

উড়েই গেল অচিন পাখি! শৈশবে শ্রদ্ধেয় শিল্পী ফরিদা পারভীনের অনেক ক্যাসেট ছিল বাসায়। নিয়মিত বাজত তাঁর কণ্ঠ। শুনতে শুনতে শুধু ভাবতাম, লালনগীতি নামে এই ধারাটা মনে হয় শুধু তাঁরই। সব গানের মালিক তিনি। কারণ, এত মায়া দিয়ে যিনি ধারণ করতে পারেন লালনের গান, এই গান তো তাঁরই হয়ে যাওয়ার কথা! কত গান শিখেছি, তুলেছি তাঁর ক্যাসেট শুনে! প্রকৃতির নিয়মে তিনি চলে গেলেন। কিন্তু বাংলা লোকগানের ধারাকে যা দিয়ে গেলেন, তাতে বাংলার লোকগান আজীবন ঋণী রইল 
তাঁর কাছে। অনন্তলোকে শান্তিতে থাকুন প্রিয় ফরিদা পারভীন...।

আরও পড়ুন

×