তরুণদের কণ্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী গান
মুক্তির গান ছবিতে রেডিওতে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠান শোনার দৃশ্যছবি: সংগৃহীত
সাদিয়া মুনমুন
প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:২৯
অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও যে গানগুলোর আবেদন এতটুকু কমেনি, ইতিহাসের স্মারক হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হৃদয় আন্দোলিত করে যাচ্ছে; জানিয়ে দিচ্ছে কীভাবে একটি দেশ পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, জন্ম দিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশে; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালজয়ী সেই গানগুলো এবার শোনা যাবে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে।
১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশের প্রতিটি জেলায় এই আয়োজন করছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। আয়োজকরা জানিয়েছে, নতুন মাত্রার এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি জেলায় স্থানীয় শিল্পীরা পরিবেশন করবেন দেশপ্রেমের উজ্জীবনী গান; পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরতে থাকছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা।
বিজয়ের দিনের গুরুত্ব ও ইতিহাসকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আরও গভীরভাবে পৌঁছে দিতেই তাদের এ আয়োজন। সেই সুবাদে অগণিত কণ্ঠে ধ্বনিত হবে ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’, ‘নোঙর তোলো তোলো’, ‘ছোটদের বড়দের সকলের’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘শিকল পরার ছল’, ‘কারার ওই লৌহকপাট’, ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’, ‘ওই পোহাইল তিমির রাত্রি’, ‘ব্যারিকেড-বেয়নেট-বেড়াজাল’, ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’সহ অগ্নিঝরা দিনের অন্যান্য কালজয়ী গানগুলো।
শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানগুলো তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে না বিজয় দিবসের আয়োজন। একই সঙ্গে কালজয়ী এই গানগুলোর সৃষ্টি এবং কীভাবে সেগুলো সম্মুখসমরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত রেখেছিল, সেই ইতিহাসও তুলে আনা হবে। এতে করে নতুন প্রজন্মের মনের কোণে উঠে আসবে একাত্তরের সেই দিনগুলোর সংগ্রামী চিত্র। স্পষ্ট হয়ে যাবে, ১৯৭১-এ গান কীভাবে মুক্তিকামী মানুষের হাতিয়ার হয়ে ওঠেছিল। এ প্রজন্ম জেনে যাবে, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ইথারে ভেসে আসা গানগুলো একদিকে যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল শ্রোতাদের, তেমনি শোণিত ধারায় বইয়ে দিয়েছিল অগ্নিস্রোতে। একইভাবে সম্মুখযোদ্ধাদের সাহস-শক্তি জোগাতে, স্বাধীন দেশের মানচিত্র ছিনিয়ে আনতে তখন গানই হয়ে উঠেছিল বড় হাতিয়ার।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিটি গান নিয়ে আলাদা করে লেখা যায় ঐতিহাসিক গল্প। যেমন ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানের কথা বলতে গেলেও মনে হবে, যুদ্ধদিনের অন্যরকম এক কাহিনি আমাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এ শুধু গল্প নয়, ইতিহাসের এক অধ্যায়। বরেণ্য শিল্পী ও সুরকার আপেল মাহমুদের বয়ানে সেটি তুলে ধরছি। যে গল্পটি তিনি এভাবেই তুলে ধরছেন– একাত্তরের জুন মাসের কথা। তখন আমাদের ঘরবাড়ি ঠিকানা বলতে একটাই, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। থাকা-খাওয়া-ঘুমানো-গান বাঁধা-গান গাওয়া, এই ছিল নিয়মিত রুটিন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশের পতাকাতলে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বিভোর ছিলাম আমরা। হঠাৎ একদিন গোবিন্দ হালদার নামে মানুষটি সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেদিনই প্রথম পরিচয়। তাঁর কথা থেকেই জানতে পারি, লেখালেখি রক্তে মিশে আছে।
গোবিন্দ হালদার আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর লেখা গানের একটি পাণ্ডুলিপি। যে পাণ্ডুলিপির একেকটি গীতিকবিতায় চোখ বুলিয়ে কোনোভাবেই মেলাতে পারিনি, গোবিন্দ হালদারের সাদাসিধে অবয়বের সঙ্গে। কারণ তাঁর পাণ্ডুলিপিতে গান নয়, সে ছিল বারুদ। তাই বিস্ময় নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছি, একজন মানুষের মনে কতটা আগুন লুকিয়ে থাকলে এমন সব গান লেখা যায়? তাঁর অন্যান্য গানের মতো ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানের কথাগুলো পড়েও অবাক হয়েছিলাম। মুগ্ধ হয়েছিলাম গানের কথায় বিশ্বশান্তি, নারী, ফুল, মাটি আর মানুষের কথা কী চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেখে! শব্দ মানুষকে কাঁদাতে পারে, হাসাতে পারে, ভাসাতে পারে, মনের মাঝে জন্ম দিতে পারে রাগ-ক্ষোভ-জ্বালা; করে তুলতে পারে বিদ্রোহী– গণসংগীত গাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে এটা জেনেছি।
আরও একবার শব্দের শক্তির সম্পর্কে নতুন করে ধারণা জন্মে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানের কথা মনে পড়ে। যা হোক, গানটি হাতে আসার পর খুব একটা সময় নিইনি। বসে গেছি সুর করতে। সুর করতে গিয়ে নিজেই এক ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। জুন মাসেই গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে রেকর্ড করা হয়। গানটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক ছিল– সে কথা পরে অনেকেই স্বীকার করেছেন। এরপর মুক্ত স্বাধীন দেশের পতাকাতলে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত গানে গানে যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। আপেল মাহমুদের মতো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যান্য শিল্পীরাও তাদের প্রতিটি গান নিয়ে মেতে ধরেছেন ইতিহাসের পাতা। এবারের বিজয় দিবসে নতুন প্রজন্ম গানে গানে সেই ইতিহাসের পরিভ্রমণ করাবে দর্শক-শ্রোতাদের।