ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাবিনা ইয়াসমিন একটি কণ্ঠ, একটি ইতিহাস

সাবিনা ইয়াসমিন একটি কণ্ঠ, একটি ইতিহাস
×

সাবিনা ইয়াসমিন ১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২২

বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, হয়ে ওঠে এক ইতিহাস। সেই কণ্ঠগুলোর অন্যতম সাবিনা ইয়াসমিন। দীর্ঘ কয়েক দশকের সংগীতজীবনে অসংখ্য গান দিয়ে তিনি ছুঁয়েছেন মানুষের হৃদয়। দেশাত্মবোধক গান, চলচ্চিত্রের গান, আধুনিক কিংবা লোকগান–গানের নানা ধারায় তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে।

আজ এই বরেণ্য কণ্ঠশিল্পীর জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছেন সংগীতপ্রেমীরা।

শৈশব থেকে গানের সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিনের সখ্য। সংগীতনির্ভর পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকে তিনি পেয়েছেন গানের পরিবেশ। অল্প বয়সে তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য নজর কাড়ে। এরপর ধীরে ধীরে পেশাদার সংগীতজগতে শুরু হয় তাঁর পথচলা। সময়ের সঙ্গে সে কণ্ঠ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মানুষের অতিপরিচিত ও প্রিয় এক কণ্ঠ।

চলচ্চিত্রের গানে সাবিনা ইয়াসমিনের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ষাটের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে অসংখ্য গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। রোমান্টিক গান থেকে বিরহ, জীবনবোধ থেকে দেশপ্রেম–প্রতিটি আবেগকে তিনি নিজের কণ্ঠে এমনভাবে ধারণ করেছেন, যা শ্রোতার মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলেছে। তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলোও বাংলা গানের ভান্ডারের অমূল্য সম্পদ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা কিংবা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা–এসব অনুভূতি তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে গভীর আবেগ ও শক্তি। ফলে তাঁর গান শুধু বিনোদনের বিষয় হয়ে থাকেনি; বরং অনেক গান হয়ে উঠেছে বাঙালির আবেগ ও ইতিহাসের অংশ।

সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর আবেগ ও স্বচ্ছতা। উচ্চকিত না হয়েও কীভাবে একটি গানকে গভীরভাবে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাঁর গায়কিতে তার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। শব্দের সঠিক উচ্চারণ, সুরের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং গানের ভাবকে ধারণ করার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। চলচ্চিত্রের গানে অবদানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেছেন একাধিকবার। তবে পুরস্কার-সম্মাননার সংখ্যার চেয়েও বড় তাঁর অর্জন-প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার ভালোবাসা। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গাওয়া বহু গান আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমান আবেদন তৈরি করে। সময় বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে, শ্রোতার রুচিতেও এসেছে নানা পরিবর্তন। তাঁর গান হারিয়ে যায়নি; বরং নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে বারবার। পুরোনো দিনের শ্রোতার স্মৃতিতে যেমন তাঁর গান অমলিন, তেমনি তরুণ প্রজন্মও তাঁর কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানে–সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্টি মানুষের মনে বেঁচে থাকে।

সাবিনা ইয়াসমিন সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাঁর কণ্ঠে যে গান একসময় রেডিও, টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রের পর্দা পেরিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছেছিল, সেই গান আজও শোনা হয় একই মুগ্ধতায়। জন্মদিনে তাই সাবিনা ইয়াসমিনকে শুধু একজন বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নয়, বাংলা গানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্মরণ করা যায়। তাঁর গান প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, দেশ ও মানুষের গল্প বলে। সেই গল্পের আবেদন সময়ের সঙ্গে ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। সুরের ভুবনে তাঁর পথচলা দীর্ঘ হোক। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিক বাংলা গানের সৌন্দর্য। 

জন্মদিনে বরেণ্য এই শিল্পীর প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা।

আরও পড়ুন

×