‘এতোদিন স্বীকৃতি না পাওয়ায় আমি যতটা কষ্ট পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি হতাশ হয়েছেন শ্রোতারা’
প্রিন্স মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত
রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:৩৯ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:১২
প্রিন্স মাহমুদ। কালজয়ী সুরকার ও গীতিকবি। ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার ‘ঈশ্বর’ গানের জন্য শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এই অর্জন ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা হয় তাঁর সঙ্গে
শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন– এ জন্য অভিনন্দন। এই অর্জনের অনুভূতিটা জানতে চাই।
যা থাকে অনুভবে, তার প্রকাশ ভাষায় হয় না। হ্যাঁ এটা সত্যি, প্রতিটি স্বীকৃতি ভালো লাগার। তাই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হওয়ায় অন্যরকম এক ভালো লাগায় মনটা ছেয়ে গেছে। তবে শুধু ভালো লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি এমন নয়। এই অর্জনে দায়িত্বও যে অনেকে বেড়ে গেছে, তা বুঝতে পারছি। এখন সেই দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। আর যাদের হাত ধরে এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি– ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার সেই টিম এবং পুরস্কারের জুরিদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।

অনেকের মত, বহু আগেই আপনাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল। আপনার কখনও কি এমন কথা মনে হয়েছে?
আমি সব সময় সৃষ্টির মাঝেই ডুবে ছিলাম। সৃষ্টির আনন্দে একের পর এক সৃষ্টি করে গেছি। তাই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাবনিকাশ কখনও করিনি। যারা মনে করেন অনেক আগেই আমাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল, সেটা একান্তই তাদের মত। অবশ্য তাদের মতামতকে অসম্মান করার কিছু নেই। কারণ আমার একেকটি সৃষ্টি তাদের মনে কীভাবে ছাপ ফেলেছে, সমকালীন অন্যান্য আয়োজন থেকে সেগুলো কতটা আলাদা হয়ে উঠেছে, কথা, সুর ও সংগীতের মান কেমন– এসবের বিচারক সেই সব শ্রোতা। তাই প্রত্যাশার জায়গা থেকে তারা তাদের মতপ্রকাশ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে এ কথাও সবার জানা উচিত, সিনেমার গান ছাড়া সুরকারদের জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
‘প্রিয়তমা’র আগেও সিনেমায় গানে সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন। আপনার প্রতিটি সিনেমার গানই শ্রোতা মনে আঁচড় কেটেছে। তার পরও কি মনে হয়নি, সেই গানগুলোর জন্য পুরস্কার পেতে পারেন?
বলব না আগে কখনও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার আশা করিনি, করেছি। প্রথমবার ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কষ্ট’ সিনেমায় জেমসের গাওয়া ‘মা’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আশা করেছিলাম। কারণ সেই সময় অনেকে বলেছিলেন, তিনটি শাখায় এই গানটি পুরস্কার পেতে পারে। কিন্তু তাদের এই কথা শেষমেশ সত্যি হয়নি। যদিও তখন বয়স কম ছিল, পুরস্কার না পাওয়া শুরুতে একটু খারাপ লেগেছে। তবে খারাপ লাগা কেটে যেতেও সময় লাগেনি। এরপর ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘থার্ড পারসর সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমায় লিমনের গাওয়া ‘জেলখানার চিঠি’ গানের জন্য দারুণ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। এই গানটি পুরস্কার এনে দিতে পারে– এমন ভাবনা মনের মধ্যে কাজ করেছিল। কিন্তু তখনও কোনো স্বীকৃতি পাইনি। তাই এবার সত্যিই মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এরপর কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি গান করেছিলাম। সেই গানের স্বীকৃতি না পাওয়াতেও আশাহত হয়েছি। তার পরও সৃষ্টি উল্লাসে মেতে উঠতে এক মুহূর্ত সময় লাগেনি। গানের ভুবনে নিজের মতো করে কাজ করে গেছি।
বারবার আশাহত হয়েও নতুন উদ্যমে কাজ করে যেতে পারার মন্ত্রটা কী?
পুরস্কার না পাওয়া নিয়ে আমার যতটা না মন খারাপ হতো, তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগত কাজের মানুষদের কথা শুনে। বুঝতাম স্বীকৃতি না পাওয়ায় আমি যতটা কষ্ট পেয়েছি, তার চেয়ে বেশি হতাশ হয়েছে তারা। এই যে সব কাছের মানুষ আর ভক্ত-অনুরাগী, আমার কাজের প্রতি যাদের ভীষণ ভালো লাগা, ভালোবাসা– তারাই মূলত আমার প্রতিটি কাজের মূল শক্তি ও সাহস। তাদের কথা ভেবেই যে কোনো পরিস্থিতিতে সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠতে পারি।

১৯৯৪ থেকে বিরতিহীনভাবে প্রতিবছর কাজ করে গেছেন। এমন একটা বছর নেই, যে বছর ঈদে আপনার গান আসেনি। ২০২৫ সালের ‘জংলি’ সিনেমার গান নিয়ে এ রকমই আলোচনা ছিল– এটা কীভাবে সম্ভব হলো?
ওই যে বললাম, সৃষ্টির আনন্দে সৃষ্টি করি। গান ছাড়া অন্য কিছুই যে আমার দ্বারা হয় না। সম্পূর্ণ মনোযোগ গানের ভেতরেই রাখি। হ্যাঁ প্রিয়তমার ‘ঈশ্বর’ বা রাজকুমারের ‘বরবাদ হয়ে যাচ্ছি’ গানের মতো জংলির গানগুলোও পছন্দ করেছে। এটাও এ সময় এসে প্রাণিত করছে আরও ভালো কাজ করার।
‘বরবাদ হয়ে যাচ্ছি’ গানটির সুর তো ভালো, সেটা অনেকে বলেছে। কিন্তু লিরিক্সও অন্যরকম মায়া তৈরি করে। আলাদাভাবে কানে লাগে। এই মায়াটা কী?
হ্যাঁ, ‘রাজকুমার’ সিনেমার ‘বরবাদ’ গানটা সবার প্রিয় হয়ে উঠেছে কারণ, সম্ভবত এবারও গানের মধ্যে মায়া ছড়াতে পেরেছি। গান তৈরির সময় নিজের ভেতরের মায়া গানে ছড়াই। এ কারণেই হয়তো সবাই সেটা পছন্দ করে ফেলে।
এবার নতুন আয়োজনের কথা জানতে চাই, কী নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে?
এবার নতুন আয়োজনের কথা জানতে চাই, কী নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে? বাহান্ন, একাত্তর, জুলাই চব্বিশ ও বিভিন্ন সময়ের বীর শহীদদের নিয়ে গান তৈরি করে যাচ্ছি। যার প্রথম গানটি প্রয়াত প্রতিবাদী তরুণ আবরার ফাহাদকে নিয়ে লেখা। বেশ কিছু কমার্শিয়াল কাজ ছেড়েছি শুধু আবরার ফাহাদসহ জুলাই শহীদদের নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করব বলে। পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের অগ্রসৈনিক, শহীদি মিছিলের নেতা আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম আকরাম, শাইখ আশহাবুল ইয়ামিনসহ সাতজনকে নিয়ে কাজ করছি। এই কাজে কোনো তাড়াহুড়া করছি না। আবরার ফাহাদ ন্যায়ের প্রতীক কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। তাঁকে নিয়ে সবার আগে প্রথম প্রতিবাদ করেছি। দিনের পর দিন লিখে গেছি। করছি ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে গান। কিংবদন্তি এই ভাষা সৈনিক ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবি জানিয়ে ছিলেন। এমন কিছু বিষয় এই গানে এনেছি যা হয়ত কোনো গানে আগে আসেনি। থাকছে একাত্তরের চার মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তৈরি করা ভিন্ন ধাঁচের গান। এ ছাড়াও ২৫ শে মার্চ, ১৯৭১ কালরাতে গণহত্যার শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে পাঁচটি গান এর আগে করেছিলাম। সেটা একদম নতুন আয়োজনে আবারও করছি, যেগুলো শ্রোতামনে আলোড়ন তুলবে বলেই আমার বিশ্বাস। সব গানগুলো একসাথে আনতে চাই। গানগুলো শোষকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হবে, ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কথা বলবে। জুলুমের অবসান ঘটিয়ে সাম্য ও মানবিক সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে এই গানগুলোতে। প্রান্তিক মানুষের কন্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবে। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের কথা বলবে। সংবাদের শিরোনাম হতে নয়, নিজের জন্য করেছি। তাড়না থেকে করেছি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত জ্ঞান বা উপলব্ধি থেকে বুঝি, সব গান গান হয়ে ওঠে না। এই গানগুলো গান হবে আশা করছি।
- বিষয় :
- প্রিন্স মাহমুদ
