অনিশ্চয়তায় সরকারি অনুদানের সিনেমা
ছবি: সংগৃহীত
মীর সামী
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ১৩:৫৬
চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ, নতুন নির্মাতাদের উৎসাহ প্রদান এবং সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অনুদান দিয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৩০ জুন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তালিকাসংক্রান্ত সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেই প্রজ্ঞাপনে ১২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য, ২০টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রসহ মোট ৩২টি প্রকল্পকে অনুদান দেওয়া হয়। পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ৭৫ লাখ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের ৬ নম্বর শর্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম কিস্তির (প্রি-প্রোডাকশন) ২০ শতাংশ অর্থ পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্মাতারা।
অনুদানপ্রাপ্ত কয়েকজন নির্মাতা ও প্রযোজকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম কিস্তির অর্থ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও দ্বিতীয় কিস্তির [৫০ শতাংশ] অর্থ এখনও হাতে পাননি তারা। ফলে সিনেমার শুটিং পরিকল্পনা, শিল্পীদের শিডিউল, লোকেশন বুকিং থেকে শুরু করে মুক্তির সময়সূচি–সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
অনুদানের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ে বিলম্বের বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছেন আলভী আহমেদ [জীবন অপেরা], সিংখানু মারমা [পরোটার স্বাদ], গোলাম সোহরাব দোদুল [জলযুদ্ধ] এবং জগন্ময় পাল [রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান]। চিঠিতে তারা বলেছেন, সময়মতো অর্থ ছাড় না হলে শিল্পীদের শিডিউল, নির্ধারিত মৌসুমে শুটিং এবং পরিকল্পিত সময়ে মুক্তি–সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
‘জলযুদ্ধ’ সিনেমার নির্মাতা গোলাম সোহরাব দোদুল বলেন, ‘আমার সিনেমার মোট বাজেট অনুদানের টাকার চেয়ে অনেক বেশি। অনুদানের অর্থের পাশাপাশি অন্য উৎস থেকেও বিনিয়োগ আনতে হবে। দ্বিতীয় কিস্তির টাকা না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়াটিও আটকে আছে। ফলে আমি এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছি। অনুদানের টাকা না পাওয়ায় যেমন শুটিং শুরু করতে পারছি না, তেমনি বিকল্প অর্থায়নের পথও এগোচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা করতে হয়। শুটিংয়ের সময়সূচি, শিল্পীদের সময়, লোকেশন, কারিগরি টিম। সবকিছু আগে থেকেই সমন্বয় করতে হয়। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে পুরো পরিকল্পনাই ভেঙে যায়। পরে আবার সবকিছু নতুন করে গুছিয়ে আনতে হয়, যা সময় ও ব্যয়–উভয়ই বাড়িয়ে দেয়।’ শিশুতোষ শাখায় অনুদান পাওয়া চলচ্চিত্র ‘রবিনহুডের আশ্চর্য অভিযান’ সিনেমার প্রযোজক জগন্ময় পাল বলেন, ‘প্রথম কিস্তির টাকা পাওয়ার পর আমরা নিয়ম অনুযায়ী শিল্পীদের শিডিউল চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। পরিকল্পনা ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুটিং শুরু করার। দ্বিতীয় কিস্তির টাকা না পাওয়ায় পুরো পরিকল্পনাই আটকে গেছে। যেসব শিল্পীর সময় নিয়েছিলাম, তাদের ছেড়ে দিতে হয়েছে। এখন নতুন করে নিতে গেলে অনেক শিল্পী হয়তো আর সময় দিতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন জনপ্রিয় শিল্পীর সময় পাওয়া এখন খুবই কঠিন। কয়েক মাস আগে যে সময় পেয়েছিলাম, এখন হয়তো ছয় মাস বা এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। এতে শুধু শুটিং নয়, পোস্ট-প্রোডাকশন ও মুক্তির পরিকল্পনাও পিছিয়ে যাবে।’ একই ধরনের সংকটের মুখে রয়েছেন ‘পরোটার স্বাদ’ সিনেমা নির্মাতা সিংখানু মারমা। পাহাড়ি অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নির্মিতব্য এই চলচ্চিত্রের জন্য নির্দিষ্ট ঋতু ও আবহাওয়ায় দৃশ্যধারণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমার ছবির গল্পের সঙ্গে প্রকৃতির একটি সম্পর্ক আছে। কিছু দৃশ্য নির্দিষ্ট সময়ে না করলে সেটি আর আগের মতো করে ধারণ করা সম্ভব হবে না। অর্থ না পাওয়ায় সেই সময়টা আমরা হারিয়ে ফেলছি।’ সিংখানু আরও বলেন, ‘আমার ছবির অধিকাংশ শিল্পী শিশু। তাদের নিয়ে দীর্ঘদিন কর্মশালা করেছি। শুটিং বিলম্বিত হলে তারা বড় হয়ে যাবে, ফলে চরিত্রের সঙ্গে আর মানানসই থাকবে না। এরই মধ্যে ছবির একজন গুরুত্বপূর্ণ বয়স্ক অভিনেতা মারা গেছেন। এটি আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। সময় যত যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন জটিলতা তৈরি হচ্ছে।’
অন্যদিকে প্রধান অভিনয়শিল্পীর শিডিউল সংকটের কারণে অনুদানের অর্থের অপেক্ষা না করে ঋণ নিয়ে শুটিং শেষ করেছেন ‘জীবন অপেরা’ সিনেমার নির্মাতা আলভী আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘আমার ছবির প্রধান শিল্পীর পরবর্তী দুই বছর কোনো সময় খালি ছিল না। তাই ঝুঁকি নিয়ে ঋণ করে শুটিং শেষ করেছি। ভেবেছিলাম জানুয়ারিতে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা চলে আসবে। এখনও পাইনি।’ আলভীর ভাষ্য, ‘একজন নির্মাতা যখন ঋণ করে কাজ করেন, তখন প্রতিদিন তাঁর আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে। এখন পাওনাদারদের তাগাদা সামলাতে হচ্ছে। যদি সময়মতো টাকা পেতাম, তাহলে এই পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই হয়তো এখনও শুটিং শুরু করতে পারেননি। কারণ, জনপ্রিয় শিল্পীদের সময় পাওয়া, ইউনিট গঠন করা, লোকেশন ঠিক রাখা–এসবের জন্য অর্থের নিশ্চয়তা দরকার। এখন সময় পাওয়া গেলেও কয়েক মাস পর সেটি আর পাওয়া যাবে না। তখন পুরো পরিকল্পনাই নতুন করে সাজাতে হবে।’
চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের মতে, চলচ্চিত্র নির্মাণ একটি সময়নির্ভর প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট মৌসুম, শিল্পীদের শিডিউল, লোকেশন অনুমতি এবং সম্ভাব্য মুক্তির সময় বিবেচনায় রেখেই একটি চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা করা হয়। অনুদানের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে শুধু নির্মাণ ব্যয়ই বাড়ে না, বরং পুরো প্রযোজনা পরিকল্পনাই ভেঙে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রিয় শিল্পীদের সময় পুনরায় পাওয়া কঠিন হয়ে যায়, নির্ধারিত মৌসুমে শুটিং করা সম্ভব হয় না এবং মুক্তির লক্ষ্যও পিছিয়ে যায়। এ অবস্থায় অনুদানপ্রাপ্ত নির্মাতারা দ্রুত দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সময় দীর্ঘ হলে কয়েকটি চলচ্চিত্রের নির্মাণ প্রক্রিয়া প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের অনুদানের মূল উদ্দেশ্য। মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা, তাও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
- বিষয় :
- অনুদানের ছবি
