‘শুধু শিল্পী নন, তিনি আমার আজীবনের শিক্ষক’
মুস্তাফা মনোয়ার ও মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ১৩:৪৬
মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক, আমার নির্দেশক এবং জীবনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন মানুষ। তাঁর চলে যাওয়ায় আমি যেন নিজের জীবনেরই একটি বড় অধ্যায় হারিয়ে ফেললাম। আমি সবসময়ই বলি, ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যভাষা বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর মতো মানুষ এই উপমহাদেশে খুব কমই জন্মেছেন। একটি দৃশ্য, একটি ফ্রেম কিংবা একটি চরিত্রকে কীভাবে শিল্পের উচ্চতায় নিয়ে যেতে হয়, তা তিনি অসাধারণ দক্ষতায় জানতেন। টেলিভিশনে তাঁর কাজগুলো আজও বিস্ময় জাগায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ কিংবা উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘দ্য ট্রিমিং অব দ্য শো’ অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদে তিনি নির্মাণ করেন ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’। এই দুটি নাটক তিনি এমনভাবে নির্মাণ করেছিলেন যে, যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি অব টিভি ড্রামার জন্য মনোনীত হয়েছিল। এটি শুধু তাঁর নয়, বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকেরও এক বিরল অর্জন।
আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কাজের, জীবনেরও। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা একসঙ্গে ছিলাম। ১৯৭১ সালে কলকাতায় বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। সেই কঠিন সময়ে শিল্প ও সংস্কৃতিকেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। যুদ্ধের দিনগুলোর অসংখ্য স্মৃতি আজও মনে ভাসে। সেই সময় তিনি আমার লেখা ‘পশ্চিমের সিঁড়ি’ নাটকটির নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। যদিও তখন কলকাতায় নাটকটির মঞ্চায়ন করতে পারিনি। পরে স্বাধীন দেশে নাটকটির বেশ কয়েকটি মঞ্চায়ন হয়।
মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে প্রতিটি কাজ ছিল শিল্পচর্চার অংশ, প্রতিটি মহড়া ছিল শেখার জায়গা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে তাঁর অবদান আলাদাভাবে স্মরণ করার মতো। ১৯৬৪ সালে টেলিভিশনের যাত্রালগ্নেই স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন। পরে দীর্ঘদিন উপমহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পদ নয়, তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সৃষ্টিশীলতা। শিশুদের জন্য নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠানের রূপকার তিনি। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিল্পী গড়ে ওঠার পেছনে এই অনুষ্ঠান অনন্য ভূমিকা রেখেছে।
অনেকেই হয়তো জানেন না, টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত ‘বাঘা ও মেনি’ চরিত্র নিয়ে পাপেট নাটক করতেন। ১৯৬৭-৬৮ সালের সেই পাপেট নাটকগুলো শুধু বিনোদন নয়; সেখানে পাকিস্তানি শাসকদের সংস্কৃতিবিরোধী মনোভাব ও তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হতো।
চিত্রশিল্পী হিসেবে জলরঙে তাঁর অবদান অনন্য। শুধু জলরং নয়, তেলরং ও গ্রাফিক্সেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, মানুষ তৈরি করেছেন, শিল্পের ভাষা তৈরি করেছেন। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য তিনি যে পরিকল্পনা, যে অনুষ্ঠান, যে নন্দনচর্চা রেখে গেছেন, তা সত্যিই অতুলনীয়।
আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর শেখানো শিল্পবোধ, তাঁর নির্মাণ, তাঁর সাহসী সাংস্কৃতিক অবস্থান এবং তাঁর স্নেহময় ব্যক্তিত্ব আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে। আমার কাছে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি আজীবনের শিক্ষক।
লেখক: বিশিষ্ট নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ
- মুস্তাফা মনোয়ার
