সাক্ষাৎকার
শিল্পকলায় গাইতে আমার ৬২ বছর লেগে গেল: রুনা লায়লা
রুনা লায়লা। ছবি: সংগৃহীত
অনিন্দ্য মামুন, ঢাকা
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৪৭ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১৬:০২
আজ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার একক সংগীত সন্ধ্যা। ৬২ বছরের সংগীতজীবনে উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত শিল্পী এবারই প্রথম গান গাইছেন দেশের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান এই কেন্দ্রে। সেই আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল শিল্পকলার জাতীয় নাট্যশালায় চলছিল প্রখ্যাত যন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে সুরের মহড়া। শ্রাবণের বৃষ্টিমুখর দুপুরে সেখানেই সমকালের মুখোমুখি হন রুনা লায়লা। কথা বলেন তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও অজানা গল্প নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন– অনিন্দ্য মামুন
সমকাল: দীর্ঘ সংগীত জীবনে প্রথমবার দেশের অন্যতম প্রধানতম সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র শিল্পকলায় গাইছেন। কেমন লাগছে?
কনসার্টে গান গাইতে পারাটা সবসময় আনন্দের। আমি তো এই গান নিয়েই বাঁচি। এমন আয়োজনে সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়, যা একজন সংগীতশিল্পীর জন্য সবসময় ভালো লাগার। প্রথমবার শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে গাইব– এটাও ভালো লাগছে। যারা আমাকে নিয়ে এই আয়োজন করছে তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সমকাল: আয়োজনটি নিয়ে দারুণ সাড়া পড়েছে। ইতোমধ্যে সব টিকিটও সোল্ড আউট...
রুনা লায়লা: হ্যাঁ, এটা আমিও শুনেছি। ভেন্যুর ধারণ ক্ষমতাও তো বেশি মানুষের না। মাত্র ৬ থেকে ৭০০ মানুষের। ধারণ ক্ষমতা আরও থাকলে আমার বিশ্বাস আরও অনেক মানুষ কনসার্ট উপভোগ করার সুযোগ পেতেন। বাইরে হলে হয়তো হাজার হাজার মানুষ এতে যুক্ত হতে পারতেন কিন্তু শিল্পকলা চাইছে সংগীত সন্ধ্যাটা শিল্পকলার মধ্যেই হোক। এমন একটি আয়োজনের স্মৃতি শিল্পকলার মাঠে স্মৃতি হয়ে থাকুক। আমিও সেটাই চাই। ৬২ বছরের সংগীত ক্যারিয়ারে কত জায়গায় গাইলাম। দেশ-বিদেশের কত কত মঞ্চে বাংলা, হিন্দি ও উর্দু গান গেয়ে স্মৃতি জমালাম, আর নিজের দেশের শিল্পকলা একাডেমিতে গাইতে আমার ৬২ বছর লেগে গেল!

সমকাল: ৬২ বছর কেন লাগল?
রুনা লায়লা: আমি জানি না। হয়তো তারা এমন আয়োজন করার প্রয়োজন মনে করেনি। এখন মনে করছে। জীবনের এই সময়ে এসে গাইছি, এটাই ভালোলাগার। তাই আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সমকাল: গান নিয়ে কত অর্জন আপনার। এখনও গানযাত্রা আপনি স্বতঃস্ফূর্ত। তরুণদের সঙ্গে সমানতালে গেয়ে যাচ্ছেন...
রুনা লায়লা: আমি সবসময় নতুনের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চাই। তাই তরুণদের সঙ্গে কাজ করতেও ভালো লাগে। ওদের মধ্যে নতুন নতুন অনেক আইডিয়া থাকে, নতুন সৃষ্টি ও নতুন এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে দারুণ কিছু করার চেষ্টা ওদের মধ্যে থাকে। বেশ কিছুদিন আগে প্রীতম হাসানের সঙ্গে জ্বালা জ্বালা শিরোনামে একটি প্লেব্যাক করেছি। গানটিতে দারুণ সাড়াও পাই। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন এমন গান আমি কীভাবে গাইলাম। কিছুদিন আগে বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গেও একটি গান করেছি। সেটাও শিগগিরই প্রকাশ পাবে।

সমকাল: কিন্তু তরুণদের অনেকে তো এখন এআই কিংবা অটো টিউন প্রযুক্তির মাধ্যমে গান করছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন...
রুনা লায়লা: যারা অটো টিউনে গান করেন, তাদের সঙ্গে আমার কাজ করা হয় না। আমি এটা সাপোর্টও করছি না। গানটা আমি ভালোবাসা দিয়ে গাই। একবার ভুল হলে সে লাইনটা বারবার গেয়ে ঠিক করে গাওয়ার চর্চায় বিশ্বাসী আমি। এভাবেই গানটা করি। কনসার্টেও আমাকে যদি গাইতে হয় আমি কখনও প্রি-রেকর্ডেড গানের সঙ্গে লিপসিং করি না। গানটা সরাসরিও গাইতে চাই। লাইভ গাওয়া ও শোনার মধ্যে আলাদা একটা মজা রয়েছে। তরুণদের যারা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন নতুন ইনস্ট্রুমেন্ট হয়তো যুক্ত করে গান তৈরি করছেন, তাদের সবার প্রতিই শুভ কামনা। তবে গানটি যেভাবে, যে প্রযুক্তিতেই তৈরি হোক না কেন, গানের বেসিক মেলোডিটা শিল্পীর গাওয়াটা, সুরটা ভালো হতে হবে, গাওয়ায় দরদ থাকতে হবে। যেমন কোক স্টুডিওতে আমি যখন ‘দামা দম মাস্ত কালান্দার’ গানটি গাইলাম তখন দেখলাম, তারা অদ্ভুত সুন্দর একটা অবস্থা তৈরি করল। এতে করে গানটা আরও দারুণ হয়ে উঠল। বিষয়টা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে।
সমকাল: আপনার নিজের নামে একটা ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। সেখানে বেশ পুরোনো পুরোনো গান রয়েছে। নতুন গান কি এখানে প্রকাশ করা হবে না?
রুনা লায়লা: হ্যাঁ, হবে। আমার গাওয়া পুরোনো অনেক গানই এখান প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন গানও আসবে। বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে যে গানটি করা হয়েছে, সেটা আমার চ্যানেলও প্রকাশ পাবে।

সমকাল: প্রায় দশ হাজারের মতো গান গেয়েছেন। এত এত গানের মধ্যে কোন গানটির বেলায় সবচেয়ে বেশি সাড়া শ্রোতাদের অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটাতে দেখেছেন?
রুনা লায়লা: একেক গানের বেলায় শ্রোতাদের একেক রকম ভালোবাসা দেখেছি। এমন অনেক গানের কথাই বলা যাবে। তবে বেশি ভালোবাসা ও অদ্ভুত পরিস্থিতি দেখেছি ‘দামা দম মাস্ত কালান্দার’ গানটির বেলায়। গানটি তো শাহবাজ কালান্দারকে নিয়ে। যিনি বড় একজন পীর ছিলেন। বাংলাদেশ-ভারত ও পাকিস্তান তিন দেশের দর্শক তো রয়েছেই পাশাপাশি আমি লন্ডন, আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক কনসার্টে গাইতে গিয়ে গানটির বেলায় নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছি। গানটির মূল স্রষ্টা কে, সেটা আমি আজও জানি না। তবে অনেকেই গেয়েছেন, তার মধ্যে সম্ভবত আমার গাওয়াটাই সর্বাধিক জনপ্রিয়। প্রতিটি কনসার্টেই এই গানের রিকোয়েস্ট থাকে। শ্রোতারা এর মাঝে ঐশ্বরিক একটা ব্যাপার খুঁজে পান। লন্ডনে একবার এমন হয়েছিল, গানটি শ্রোতারা শুনতে শুনতে বেহুঁশ হয়ে গিয়েছিল। পরে অ্যাম্বুলেন্স এনে তাদের চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সমকাল: বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে একটা কথা প্রচলিত আছে, ভারতীয় কেউ একজন বলেছিলেন তোমরা আমাদের রুনাকে দাও, আমরা তোমাদের ফারাক্কা দিয়ে দেব’ এই কথাটার সত্যিকার কোনো ভিত্তি আছে কী?
রুনা লায়লা: হ্যাঁ, আছে। কথাটি বলেছিলেন ভারতের সাংবাদিক ও লেখক খুশবন্ত সিং। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে মজা করার চমৎকার ক্ষমতাও ছিল তাঁর। ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়ার সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। এই ভদ্রলোকই এই কথা বলেছিলেন।
সমকাল: ঠিক কিসের পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা বলেছিলেন তিনি?
রুনা লায়লা: খুশবন্ত সিংকে যারা জানেন, তারা বুঝবেন তিনি সমালোচক ছিলেন। প্রশংসা কম করতেন, সমালোচনাটা বেশি করতেন তিনি। দিল্লিতে একবার আমার একটা কনসার্ট ছিল। সেখানেই এসেছিলেন তিনি। আমার সঙ্গে তাঁর দেখাও হয়নি। পুরো কনসার্টটির শেষ পর্যন্ত তিনি আমার গান শুনেছেন। পরে তাঁর পত্রিকায় আমাকে নিয়ে অনেক কিছু লিখেনও। সেই লেখার মধ্যেই বাংলাদেশ সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি লেখেন, আমি শুধু একটা ‘প্লিজ গিভ আস রুনা লায়লা, অ্যান্ড টেক অল দ্য ওয়াটার অব ফারাক্কা।’
সমকাল: দর্শকদের গভীর ভালোবাসায় আবিষ্ট জীবন আপনার। প্রাপ্তির খাতাটাও পরিণত। তারপরও জানতে চাইব এমন কোনো ইচ্ছে ছিল কি যা এখনও পূরণ হয়নি?
রুনা লায়লা: আমার বোন দিনা লায়লার নামে ক্যান্সার হাসপাতাল করার ইচ্ছে ছিল। সেটা হয়নি। তবে শিশু হসপিটালে একটা ওয়ার্ড আমি করেছি, যেটা দিনা লায়লার নামে পরিচিত। এটা বহু আগেই করেছিলাম।
সমকাল: সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পীদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। শিল্পীদের রাজনীতিতে আসা নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
রুনা লায়লা: অন্যের বেলায় আমি বলতে পারব না, আমি আমার বিষয়ে বলি, আমি রাজনীতি বুঝি না, রাজনীতিতে যাওয়ার ইচ্ছেও ছিল না, এখনও নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। আমি একজন শিল্পী, এই পরিচয়েই মানুষের ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা নিয়ে থাকতে চাই।
সমকাল: সংগীত নিয়ে দীর্ঘ এই যাত্রায় কখনও কঠিন কোনো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল আপনাকে?
রুনা লায়লা: হ্যাঁ, আমাকে দুইবার বয়কট করা হয়েছিল। কিন্তু এতে করে তো আমার গান গাওয়া থামানো যায়নি। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ যদি সহায় থাকে, আমার মধ্যে যদি মেধা থাকে, তাহলে কোনো বাধাই কাজে আসবে না। আসেওনি।
- বিষয় :
- রুনা লায়লা
- সাক্ষাৎকার
- সংগীতশিল্পী