ইলিয়াস কাঞ্চন
ভালোবাসায় ভেজা এক জীবন
ইলিয়াস কাঞ্চন। ছবি: বুলবুল ফাহিম
এমদাদুল হক মিলটন
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৩৪ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৪০
পরন্ত বিকেল। সোমবার দুপুর থেকেই রাজধানীর কাকরাইলের পাইওনিয়ার রোডে সবার অপেক্ষা– কখন আসবেন প্রিয় অভিভাবক। সাদা রঙের প্রাইভেটকারে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যার আগেই নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কার্যালয়ে ঢুকলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৫ মাস পর প্রিয় মানুষটিকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সহকর্মীরা। গেটের বাইরে তখন অপেক্ষায় ভক্তরা। প্রিয় নায়ককে একনজর দেখার আশায় তাদের চোখে-মুখে ছিল উৎকণ্ঠা আর ভালোবাসা। অসুস্থ শরীরেও মুখে স্মিত হাসি নিয়ে সবার সালামের জবাব দিলেন। অশ্রুসজল চোখে সবার কাছে দোয়া চাইলেন তিনি। পাশে থাকা ছেলে মিরাজুল মইন জয় বাবার চিকিৎসার বিষয়ে কথা বললেন।
জয় বলেন, ‘সবার সঙ্গে এই কটা দিন হাসিমুখেই ছিলেন। নিরাপদ সড়ক নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন আছে। বাবার স্বপ্নগুলো পূরণ করেত চাই। সবাই আব্বুর জন্য দোয়া করবেন।’
শুধু নিসচা কার্যালয়েই নয়, গত কয়েক দিনে ইলিয়াস কাঞ্চন যেখানে গেছেন, সেখানেই তাঁকে একনজর দেখতে ছুটে গেছেন ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। গুলশানের বাসায় চলচ্চিত্রের সিনিয়র শিল্পীরা এসেছেন, এসেছেন সহকর্মী ও দীর্ঘ দিনের বন্ধুরা। কেউ খোঁজ নিয়েছেন তাঁর শরীরের, কেউ শুনিয়েছেন পুরোনো দিনের গল্প, আবার কেউ শুধু কিছুক্ষণ পাশে বসে থেকেছেন।

দীর্ঘ ১৫ মাসেরও বেশি সময় লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকার পর মাত্র কয়েক দিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন কিংবদন্তি এই নায়ক ও নিসচার চেয়ারম্যান। গত ৩ আগস্ট দেশে ফেরার পর থেকেই গুলশানের বাসাটি যেন হয়ে উঠেছে ভালোবাসা আর আবেগের মিলনস্থল।
১২ আগস্ট সকালে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপের জন্য আবারও লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশে ফেরার পর ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে দেখা করেছেন বরেণ্য অভিনেতা আলমগীর, রোজিনা, আনোয়ারা, প্রয়াত অভিনেত্রী দিতির মেয়ে লামিয়া চৌধুরীসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও অনেকে। দীর্ঘদিন পর সহকর্মীদের কাছে পেয়ে কখনও স্মৃতিচারণ করেছেন, কখনও গল্প করেছেন, আবার কখনও আবেগে নীরব থেকেছেন।
এর মধ্যে গত শনিবার রাতে সুচন্দা ও চম্পার আগমন যেন কাঞ্চনের জন্য হয়ে ওঠে বিশেষ এক মুহূর্ত। দীর্ঘ দিনের সহকর্মী, আবার আপনজনের মতো এই দুই বোনকে সামনে পেয়ে আবেগ সামলাতে পারেননি তিনি। হাসি-আড্ডায় ফিরে গিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের পুরোনো দিনগুলোতে। চম্পার সঙ্গে আবেগঘন কথোপকথনের এক পর্যায়ে গানও গেয়েছেন কাঞ্চন।

চম্পা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন জমজমের পানি ও কয়েকটি পাঞ্জাবি। নিজের হাতে কাঞ্চনকে জমজমের পানি পান করান তিনি। উপহার দেওয়া পাঞ্জাবিগুলো লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধও করেন। সেই আড্ডায় ছিলেন পরিচালক গাজী মাহবুবসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের আরও কয়েকজন।
কাঞ্চনের এই স্বস্তির সময় খুব বেশি দিনের নয়। চিকিৎসার প্রয়োজনেই আবার তাঁকে ফিরতে হচ্ছে লন্ডনে। ব্রেন টিউমার ধরা পড়ার পর ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা নিচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা টিউমারের বড় একটি অংশ অপসারণ করতে সক্ষম হলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। পরে তাঁকে ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ ও কঠিন চিকিৎসা।
এবার লন্ডনে ফিরে মাউন্ট ভার্নন হাসপাতালে আবারও চিকিৎসা শুরু হবে। করাতে হবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কাঞ্চন বলেন, ‘দেশে আসার পর আরাম বোধ করছি। অনেকেই আসছেন, দেখা করছেন, কথা বলছি, ভীষণ ভালো লাগছে।’

১২ আগস্ট কয়েক দিনের স্বদেশবাস শেষ করে ফিরবেন চিকিৎসার নতুন লড়াইয়ে। সঙ্গে নিয়ে যাবেন সহকর্মীদের ভালোবাসা, ভক্তদের শুভকামনা আর অগণিত মানুষের দোয়া।
- বিষয় :
- ইলিয়াস কাঞ্চন
- অসুস্থ