সেলিম আল দীন জন্মোৎসব আজ থেকে শুরু
সেলিম আল দীন
আনন্দ প্রতিদিন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৩৯ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:৪১
বাংলা নাটকের শিকড় ও নিজস্ব ঐতিহ্যের সন্ধানে আজীবন কাজ করেছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। লোকজ জীবন, ইতিহাস, পুরাণ ও মানুষের অস্তিত্বের নানা সংকটকে তিনি নাটকের বিষয় করেছেন। প্রচলিত নাট্যরীতির বাইরে গিয়ে বাঙালির নিজস্ব আখ্যান, ভাষা ও পরিবেশন রীতিকে আধুনিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আজ ১৮ আগস্ট তাঁর ৭৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনীর সেনেরখিলে জন্মগ্রহণ করেন সেলিম আল দীন।
নাট্যকারের পাশাপাশি তিনি ছিলেন নাট্যতাত্ত্বিক ও গবেষক। বাংলা নাটকের ইতিহাস ও লোকনাট্যের ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গবেষণা নাট্যচর্চায় নতুন দিগন্ত তৈরি করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্বের চর্চা বিকাশেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
তাঁর হাত ধরে তৈরি হয়েছে একদল নাট্যকর্মী, যারা পরবর্তী সময়ে দেশের নাট্যাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘প্রাচ্য’সহ তাঁর বহু নাটক বাংলা নাট্যসাহিত্যে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর নাট্যে লোকজ ঐতিহ্য ও সমকালীন জীবনবোধের মেলবন্ধন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মাটির মানুষের জীবন, তাদের ভাষা, বিশ্বাস, আনন্দ-বেদনা ও অস্তিত্বের সংকট তাঁর নাটকে পেয়েছে শিল্পিত প্রকাশ।
সেলিম আল দীনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবারও আয়োজন করা হয়েছে ‘নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন-জন্মোৎসব ২০২৬’। নাট্যসংগঠন স্বপ্নদলের আয়োজনে তিন দিনের এ উৎসব শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হবে বিভিন্ন আয়োজন। এটি স্বপ্নদলের নিয়মিত এ উৎসবের ৩৪তম আসর। এবারের উৎসবের স্লোগান– ‘ঐতিহ্যধারায় সম্মুখযাত্রী বাঙলা নাট্যরথ, রবীন্দ্রনাথ-সেলিম আল দীনে পায় পূর্ণতার পথ’।
উৎসবের প্রথম দিন সকাল ১০টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলাভবন থেকে নাট্যাচার্যের সমাধি অভিমুখে বের হবে স্মরণ-শোভাযাত্রা। পরে সমাধিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করা হবে। নাট্যাচার্যের প্রতিকৃতি দিয়ে শিল্পকলা চত্বর সাজানোর পাশাপাশি তাঁর জীবন, কর্ম ও নাট্যদর্শন নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা। উৎসবের দ্বিতীয় দিন ২০ আগস্ট স্টুডিও থিয়েটারে মঞ্চস্থ হবে স্বপ্নদলের আলোচিত প্রযোজনা ‘চিত্রাঙ্গদা’।
বিকেল সাড়ে ৫টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় হবে এর ১২৪ ও ১২৫তম প্রদর্শনী। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে প্রযোজনাটি। ২১ আগস্ট একই সময়ে মঞ্চস্থ হবে সেলিম আল দীনের কালজয়ী নাটক ‘হরগজ’-এর ৫২ ও ৫৩তম প্রদর্শনী। দুই প্রযোজনারই নির্দেশনা দিয়েছেন সেলিম আল দীনের ছাত্র জাহিদ রিপন।
‘চিত্রাঙ্গদা’য় প্রেম, আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার চিরন্তন দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। অন্যদিকে ‘হরগজ’-এ ১৯৮৯ সালে মানিকগঞ্জের হরগজে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ টর্নেডোর পটভূমিতে মানুষের বিপর্যয়, অসহায়ত্ব ও সহমর্মিতার গল্প তুলে ধরেছেন সেলিম আল দীন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিপর্যয়ের মুখে মানবিকতার নানা রূপ নাটকটিকে দিয়েছে গভীর তাৎপর্য।
সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনার অন্যতম শক্তি ছিল ঐতিহ্যকে কেবল অতীতের বিষয় হিসেবে না দেখে সমকালীন জীবনের সঙ্গে তার যোগসূত্র তৈরি করা। তাই তাঁর নাটকে পুরাণ বা লোকজ আখ্যান ফিরে এলেও সেগুলো হয়ে ওঠে বর্তমান মানুষের গল্প। ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রয়াত হন সেলিম আল দীন। তাঁর মৃত্যুর পরও থেমে নেই তাঁর নাট্যভাবনার চর্চা।
দেশের বিভিন্ন মঞ্চে তাঁর নাটক নিয়মিত প্রদর্শিত হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীরা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা ও নিরীক্ষা করছেন। তাই সেলিম আল দীনের জন্মোৎসব শুধু একজন নাট্যকারকে স্মরণ করার আয়োজন নয়; এটি বাংলা নাটকের নিজস্ব শিকড়, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতারও উদযাপন।
- বিষয় :
- সেলিম আল দীন