ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সুরের মায়াজালে শেকড়ের সন্ধান

সুরের মায়াজালে শেকড়ের সন্ধান
×

শুক্রবার ফোক ফেস্টের দ্বিতীয় দিনে মালির লোকসংগীতশিল্পী হাবিব কইটের পরিবেশনা -মামুনুর রশিদ

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:২১ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:৩১

মানব সমাজে নিজেকে চেনার, শেকড়কে জানার আকুতি হাজার বছরের। বহুকাল ধরে বহু পথ পাড়ি দিয়ে যারা খুঁজেছেন জীবনের অর্থ, সৃষ্টিরহস্য আর শেকড়ের সুধা অন্বেষণে মেতে উঠেছেন বাউলিয়ানায়, তারাই গানে গানে সবার মাঝে রেখেছেন কিছু প্রশ্ন আর আত্মোপলব্ধির কিছু সত্য। বাউল, বৈষ্ণব, সাধকের সুরের পরশে মোড়া কথাগুলো আজও তাই আমাদের কাঁদায়-হাসায় এবং ভাবায়। শেকড় সন্ধানীরা তাই স্বীকার করেন, এ কেবল গান নয়, এ সুরের মায়াজালে বন্দি এক জীবনদর্শন। এর অপূর্ব সুরে আর কথায় আত্মা হয় পরিশুদ্ধ। এ কারণে লোকজ বা শেকড়ের গান সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেছে একেকটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

তাদের এই কথার সত্যমান করতে এবং মাটির গানের সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে শেকড়কে জানার আহ্বানে পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯' (ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব ২০১৯)।

তিন দিনের এ উৎসবের দ্বিতীয় দিনেও গতকাল শুক্রবার মাটির গানে মেতে উঠলেন হাজারো দর্শক-শ্রোতা। একদিকে স্বদেশের হৃদয়জাগানিয়া মেঠো টান, অন্যদিকে পাকিস্তান ও মালির লোকজ সুরে মেলবন্ধন গড়ে উঠল উৎসবের মঞ্চে। এ দিন দেখা মিলল বাংলাদেশের কাজল দেওয়ান, কামরুজ্জামান রাব্বি, শফিকুল ইসলাম এবং পাকিস্তানের হিনা নাসরুল্লাহ এবং মালির লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি হাবিব কইটে ও তার ব্যান্ড বামাদার সদস্যদের।

শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই মঞ্চে আসেন শফিকুল ইসলাম। বয়স কম হলেও এই কৈশোরেই লোকগানের পরিবেশনা দিয়ে শ্রোতার মনোযোগ কেড়েছে শফিকুল। ২০১৬ সালে সান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত 'বাউলিয়ানা'য় প্রথম রানারআপ হয়ে আলোচনায় আসে শফিকুল। এই খুদে শিল্পী বাউল ও বিচ্ছেদি গানের পাশাপাশি অন্য ঘরানার গানেও দারুণ পারদর্শী। মঞ্চে উঠেই শফিকুল গেয়ে শোনান শাহ আব্দুল করিমের 'মন মজাইলা ওরে বাউলা গান'। এরপর ধরেন বিরহের গান 'ও তুমি কই গেলা বন্ধুরে'। 'কি সুন্দর এক গানের পাখি' দিয়ে নিজের পরিবেশনা শেষ করেন এই খুদে বাউল।

শফিকুল মঞ্চ ছাড়তেই লোকসংগীতশিল্পী কামরুজ্জামান রাব্বি ওঠেন মঞ্চে। উঠেই খুলে বসেন নিজের গানের ঝুলি। একে একে তিনি গাইতে থাকেন- বাংলাদেশের ঢোল, তোমার সঙ্গে কিসের পিরিতি, আমি তো ভালা না। গ্রামের নওজোয়ান গান দিয়ে তার পরিবেশনা শেষ করেন তিনি।

পরে মঞ্চে ওঠেন কাজল দেওয়ান। ঢাকার কেরানীগঞ্জের এ গায়কের সংগীতে হাতেখড়ি শৈশবে। তার বাবা প্রখ্যাত বাউল-কবি আবদুর রাজ্জাক দেওয়ান। বাবার হাত ধরে নিজেকে বাউল গানের সুরে জড়িয়ে ফেলেছেন কাজল দেওয়ান। পালাগান ও লোকসংগীতকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে এ পর্যন্ত তিন শতাধিক অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন। মঞ্চে উঠেই তিনি শুরু করেন, দিন ফুরাইলেই ভাইঙ্গা যাইব এই রঙ্গের মেলা। এরপর একে একে গেয়ে শোনান- পিরিতের বাজার ভালো না, আমায় এত দুঃখ দিলি বন্ধু রে বন্ধু। গানের মাঝে মাঝে এর ব্যাখ্যাও করতে থাকেন কাজল দেওয়ান। তার কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকেন উপস্থিত শ্রোতারা। এর মাঝেই হুট করে গেয়ে ওঠেন- আরে ও জীবন রে, তুই জীবন ছাড়িয়া গেলে আদর করবে কে আমারে, নানা কদম তলায় আমি যাব না। ওরে বাঁশি, সুর দিয়ে জ্বালাইলি আগুন গানের মাধ্যমে কাজল দেওয়ান তার পরিবেশনা শেষ করেন।

কাজল দেওয়ানের পরিবেশনা শেষ করার পরই পুরো স্টেডিয়ামে নেমে আসে রাজ্যের নীরবতা। অন্ধকারে আলো ঝলকানি যেন জানান দেয় বিরহবাসী হয়েছেন উপস্থিত সবাই। এরপরই মঞ্চে আসেন আফ্রিকার মালির হাবিব কইটে অ্যান্ড বামাদা। মালির লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি বলা হয় এই হাবিব কইটেকে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হাবিব কইটের প্রথম অ্যালবাম 'মুসো কো' প্রকাশিত হয়। প্রথম অ্যালবামের গানগুলো দিয়ে বিশ্বের অগনিত সংগীতপ্রেমীর মনোযোগ কেড়ে নেন তিনি। সেই শুরু, এরপর আর থামার অবকাশ পাননি হাবিব। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ভিন্নধর্মী গিটারবাদন এবং গায়কি দিয়ে শ্রোতাদের প্রত্যাশা পূরণ করে চলেছেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি ব্যান্ড বামাদাকে নিয়ে প্রায় ১৭০০ কনসার্ট করেছেন; গান গেয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় মঞ্চে। এবার বাংলাদেশের দর্শকরাও শুনতে পেলেন হাবিব কইটের ঐন্দ্রজালিক সুর। আফ্রিকান লোকধারার গান নিয়ে টানা ১ ঘণ্টা মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন তিনি। পরিবেশন করেন তাদের জনপ্রিয় সব গান।

কইটের পর সুরের স্বাদ দিতে মঞ্চে আসেন বাংলাদেশের ফকির শাহাবুদ্দিন। বাউল গানের এ জাদুকর মঞ্চে উঠেই বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের গান- আল্লাহ বল মন রে পাখি দিয়ে শুরু করেন পরিবেশনা। এরপর একে একে গাইতে থাকেন একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর ও মন আমার, মাঝি পাল তুলে দে হেলা করিস না গানগুলো। আধ্যাতিকতার স্বাদমাখা এসব গানে কিছুক্ষণ ডুবে ছিলেন শ্রোতারা।

সবশেষে মঞ্চে আসেন দ্বিতীয় দিনের বহু প্রতীক্ষিত গায়িকা পাকিস্তানের হিনা নাসরুল্লাহ। তার আগমনী বার্তায় দর্শক প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠেন নতুন উদ্যমে। তার পরিবেশনায় আর্মি স্টেডিয়ামের দর্শকরা হারিয়ে যান অচেনা এক স্বপ্নলোকে। লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তার গায়কিতে মুগ্ধ হন সবাই। তার গানেই ইতি টানা হয় উৎসবের দ্বিতীয় দিনের।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া লোকসংগীতের এ আয়োজনের সমাপনী দিন আজ। আয়োজকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশ থেকে ২০০ জনের বেশি লোকশিল্পী ও কলাকুশলী এবারের আসরে অংশ নিয়েছেন। সান ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় এ উৎসব প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে। শেষ দিনের আয়োজনে আজ শনিবার গান পরিবেশন করবে পাকিস্তানের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল 'জুনুন' ও রাশিয়ার 'সাত্তুমা'।

আরও পড়ুন

×