ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

যেন এক রূপকথা

যেন এক রূপকথা
×

সাফ ফাইনালে ওরা ১১ জন

--

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২২ | ২২:১৩

স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে গন্তব্যে পৌঁছার আগে, স্বপ্নটা গাঁথতে হয়। যে গাঁথায় বিফলতা আসবে, বাধা ধেয়ে আসবে। কিছুদিন আগেও তাঁরা তেমন কোনো আলোচনায়ই ছিলেন না। অথচ আজ ওই কয়েকটা নাম সবার মুখে মুখে। এ অর্জন অনেকটা কল্পরাজ্য জয়ের মতোই। যা অর্জন করেছেন আমাদের সাফজয়ীরা। লিখেছেন লাবণী মণ্ডল

একুশ শতকে আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় অর্জন নারী জাগরণ। সাহিত্য-সংস্কৃতি-খেলাধুলা এবং আন্দোলন-প্রতিবাদে নারীর পদযাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কোনো কিছুই ত্যাগ ছাড়া অর্জিত হয় না। সাবিনারা ত্যাগ করেছেন। যে কারণে যথাসময়ে সে ফসল ঘরে তুলতে পেরেছেন। সম্প্রতি নারীর পোশাক নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এমন এক সময়ে হাফপ্যান্ট ও টি-শার্টের লাল-সবুজ জার্সি পরা মেয়েরা পুরো দেশে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিলেন। এখনও পুরো দেশে আনন্দের আমেজ বয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু একটা টুর্নামেন্ট জেতা নয়; বরং দেশের নারী ফুটবলে এক নতুন জনজোয়ার। যে জোয়ারে অংশ নিয়েছেন আবালবৃদ্ধবনিতা।

হাজারো প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে এ বন্ধুর পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবিনা আক্তার। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক। সাহসের প্রতিধ্বনি। বাহ্যিক অবয়ব, হাঁটা-চলা এবং কথা বলায় রয়েছে ভিন্ন অভিব্যক্তি। নেতৃত্বের সব গুণ যাঁর মাঝে বিরাজমান। নেতার কাজ হলো দলকে আগলে রাখা। প্রত্যেক সদস্যকে উদ্যমী করে তোলা। যেটি সাবিনা করে যাচ্ছেন বেশ কয়েক বছর ধরেই। তিনি এ অর্জনকে উৎসর্গ করেছেন, বাংলাদেশের জনগণের জন্য। তিনি ছিলেন এ যাত্রার সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাঁর হাতেই সেরা খেলোয়াডের পুরস্কার।

সাতক্ষীরায় বেড়ে ওঠা এ নারীর গল্প আর দশজন প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা নারীর মতোই। ছিল না তেমন কোনো জৌলুস। চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেননি; কিন্তু গোটা দেশকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার বাসনা তিনি পূরণ করেছেন। সাবিনা বলেন, 'গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। তবে আপনাদের ভালোবাসা, যে ভালোবাসার শক্তিকে মূল্যায়ন করতে চাই। আপনাদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়েই বহুপথ হাঁটতে চাই। যে পথ পেরিয়ে এসেছি, তা সহজ ছিল না, বাধামুক্ত পৃথিবী গড়ার হাতিয়ার হতে পারে ফুটবল। এটি নারীকে অগ্রসর করে তোলার একটি ধাপ।'

কৃষ্ণা রানী সরকার। বেড়ে উঠেছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া গ্রামে। বাড়ির আশপাশ প্রাণপ্রকৃতিতে ভরপুর। তাঁর হাসির ভেতর লুকিয়ে আছে গ্রামের সারল্য। বাবা একসময় দরজির কাজ করতেন। কৃষ্ণা ও পলাশ দুই ভাই-বোন। বাবার স্বল্প আয়েই পথচলা। ধুলামাটির সঙ্গে বেড়ে ওঠা। টিনের ঘর। মাটির বারান্দা। যেখানে মাদুর বিছিয়ে পেয়েছেন মায়ের ভালোবাসা। কখনও ভাবেননি পুরো দেশের জন্য এত বড় অর্জন বয়ে আনতে পারবেন; কিন্তু খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ ছিল তাঁর প্রিয়। তিনি বাইসাইকেল, মোটরবাইক চালাতেন। যে কারণে ছিলেন অনেকের চক্ষুশূল।

২০১১ সাল। বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের যাত্রা। যে যাত্রা তাঁকে ফুটবল খেলাটিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। কিন্তু কখনও ভাবেননি মেয়েদের ফুটবল নিয়ে এ যাত্রার কথা। ছিল প্রতিবন্ধকতা। মায়ের নিষেধ। বাবার নিমরাজি। কী হবে এসব করে, মেয়ে মানুষের এসব মানায় না- ছিল পাড়া-মহল্লার ভেতর টিটকারি। তিনি জানান, 'আমার আগ্রহ দেখে চাচা একদিন ৩ নম্বর ডিআর বল কিনে দেন। মানুষের কটুকথা সহ্য করতে না পেরে মা একদিন বঁটি দিয়ে ফুটবল কেটে ফেলেছিলেন। তবু খেলা ছাড়িনি।'

তখন তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তেন। ক্লাস ফোর-ফাইভের কথা। তাঁদের স্কুলে আরও বেশ কয়েকজন মেয়ে ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা থেমে যান সামাজিক প্রতিবন্ধকতায়। তাঁর ক্রীড়া শিক্ষক ছিলেন গোলাম রায়হান বাপন। তাঁর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার কথা জানান কৃষ্ণা। তিনি আরও জানান, 'স্যার আমাকে কতটা সহযোগিতা করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না। কোনো টাকা ছিল না। গোপালপুর আসতে পারতাম না। কারণ গোপালপুর থেকে পাথালিয়া গ্রাম ৭-৮ কিলোমিটার দূরে। ১৫ টাকা আসা-যাওয়ার ভাড়া ছিল। স্যার ভাড়া দিতেন, খাবার কিনে দিতেন।' কথাগুলো বলার সময় কৃষ্ণার চোখ ছলছল।

কলসিন্দুর মানেই সংগ্রামের নাম। অজপাড়াগাঁয়ের মেয়েরা কী দুর্দান্ত গতিতে এগিয়েছেন! মিডফিল্ডার সানজিদা আক্তার। মিডিয়ায় রয়েছে তাঁকে নিয়ে বেশ হৈ-হুল্লোড়; তিনি কিন্তু সেই কলসিন্দুরের মেয়েটিই রয়ে গেছেন। কথায় রয়েছে কলসিন্দুরের টান। তা পাল্টাতেও তেমন আগ্রহী নন সানজিদা। মুখে মধুর হাসি। চোখে দীপ্তির ছোঁয়া। পায়ে যেন সব অশুভকে তাড়ানোর জোর। সানজিদা জানান, 'আমার বেড়ে ওঠা কলসিন্দুরে। সেখানেই পড়াশোনা করেছি। ফুটবল খেলা জানতাম না। মেয়েরা ফুটবল খেলে সেটাও জানতাম না। প্রথমে আমরা হাতে বল খেলছি। পা দিয়ে বল খেলতে জানতাম না। তারপর আস্তে আস্তে পেরেছি। কিন্তু প্রথমে তো আগ্রহই ছিল না। লজ্জা পেতাম। স্যার জোর করে মাঠে নামিয়েছেন।' তিনি আরও জানান, 'এরপর আর ফুটবল না খেললে ভালো লাগত না। এক ধরনের নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি থেকে বকাঝকা শুরু হয়; কিন্তু আমার তো আর না খেললে ভালো লাগে না। কারও কথা না শুনে স্কুল ছুটির পর চুরি করে খেলতাম। পাড়া-পড়শীদের কটুকথা বাড়তে থাকে। ওগুলোতে মনোযোগ না দিয়ে আমি খেলায় মনোযোগ দিয়েছি। এরপর আমাদের ভালো ফলাফল আসে। এখন সমাজে সমর্থন বেড়েছে।'

সারাবান তহুরা খাতুন। বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। মাঠে তিনি খেলেন আক্রমণভাগে। তাঁর জার্সি নম্বর ১০। চুলের ছাঁট, মাঠে ক্ষিপ্রগতিতে বল নিয়ে দৌড়ানো, দৃষ্টিনন্দন গোল করা, হ্যাটট্রিক করা- সবকিছু মিলিয়ে তহুরাকে অনেকেই বলেন 'বাংলার মেসি'।

রক্ষণশীল পরিবারে বেড়ে ওঠা। প্রাইমারি স্কুলের স্যারদের সহযোগিতায় যাত্রা শুরু করেন। তিনি জানান, 'ধার্মিক পরিবারে বেড়ে ওঠা আমার। গ্রামের মানুষ কটুকথা শোনাতেন। এসব শুনে অনেক সময় ভেবেছি খেলাধুলা ছেড়ে দেব, আবার সাহস করে টিকে থেকেছি। কষ্ট লাগত মানুষের কথায়। পরিবার খেলাধুলা ছাড়ার কথা বলত, আমি তাদের সরাসরি প্রতিবাদ না করে, শুধু বলতাম এই তো আগামীবার ছাড়ব! সুতরাং আমার লড়াইটা আরও কঠিন। পরিবার ও নিজের সঙ্গেও লড়তে হয়েছে।'

একই গ্রাম থেকে আটজন খেলছেন। তহুরা খাতুন জানান, 'প্রথম যখন নেপালে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে যাই, তখন তো লিফটে উঠতে পারতাম না। লিফটে উঠতে গিয়ে ভয়ে আমি শেষ (একটু হাসি দিয়ে)।'

সমাজের হাজারো বাধা সত্ত্বেও মেয়েরা এগিয়েছেন। তাঁরা এসেছেন সমাজের নিচের ধাপ থেকে। দেখিয়েছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই স্বপ্ন জয় করা যায়। গড়ে ওঠে রূপকথার বাস্তব গল্প।

আরও পড়ুন

×